Friday, February 26, 2016

শিয়া সম্প্রদায় এবং তাদের কুফরী বিশ্বাস


৹ শিয়া ধর্মমতে তাদের ইমামরা নবীগণের মত নিস্পাপ৷ সব ধরনের গুনাহ থেকে পবিত্র৷
৹ ইমামদের মর্যাদা নবুওতেরও উর্ধ্বে৷
৹ ইমামরা হযরত মোহাম্মদ সাঃ-এর সমমর্যাদার৷
৹ ইমামদের অতীত ও ভবিষ্যতের জ্ঞান অর্জিত ছিল৷
৹ ইমামগণ কিয়ামতের দিন সমসাময়িক লোকদের জন্য সাক্ষ্য দিবেন৷
৹ ইমামদের সামনে মানুষের দিবারাত্রির আমল পেশ করা হয়৷
৹ ইমামদের নিকট ফেরেশতা আশা যাওয়া করে৷
৹ প্রত্যেক জুমার রাতে ইমামদের মেরাজ হয়৷ তারা আরশ পর্যন্ত পৌঁছে৷ সেখান থেকে তারা অসংখ্য নতুন জ্ঞান ও প্রজ্ঞা লাভ করে৷
৹ আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতা, নবী-রাসূলগণ কে যে সকল জ্ঞান দান করেছেন, তা ইমামদের অর্জিত৷ এছাড়া এমন আরো জ্ঞান অর্জিত হয়, যা ফেরেশতা, নবীগণকেও দান করা হয়নি৷
৹ ইমামরা তাদের মৃত্যুর সময় জানেন৷ তাদের মৃত্যু তাদের ইচ্ছাধীন৷
৹ ইমামদের নিকট পূর্ববতী পয়গাম্বরগণের মোজেযাও ছিল৷
৹ ইমামরা দুনিয়া ও আখেরাতের মালিক৷ তারা যাকে ইচ্ছা দান করেন এবং ক্ষমা করেন৷
৹ হযরত আলীর ইমামতি না মানার কারনে খলিফাত্রয় ও সাধারণ সাহাবায়ে কেরাম নিশ্চিত কাফের ও ধর্মত্যাগী৷
৹ ঈমান বলতে বুঝায় আমিরুল মুমিনীন আলী৷ কুফর বলতে বুঝায় আবু বকর৷ ফিসক(পাপাচার) বলতে বুঝায় ওমর৷ ইসিয়ান(অবাধ্যতা) বলতে বুঝায় উসমান৷
৹ আমিরুল মুমিনীন আলী থেকে নিয়ে বার জন ইমাম কিয়ামত পর্যন্ত সময়ের জন্য নবীগণের ন্যায় আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত৷
৹ প্রত্যেক ইমামের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে মোহর আঁটা একটি ঘাম রাসূলুল্লাহর প্রতি নাযিল হয়েছিল৷ তাতে সে ইমামের জন্য নির্দেশাবলী ছিল৷
৹ রাসূলে খোদা ইমাম মাহদীর (অন্তর্হিত ইমাম) বয়াত করাবেন৷
৹ অন্তর্হিত ইমাম আত্মপ্রকাশের পর হযরত আয়েশা রাযিঃকে জীবিত করে শাস্তি দিবেন৷
৹ অন্তর্হিত ইমাম যখন আত্মপ্রকাশ করবে, তখন কাফেরদের পূর্বে সুন্নীদের কতল করবেন৷
৹ সাহাবায়ে কেরাম প্রায় সকলে বিশেষত খলিফাত্রয় কাফের, ধর্মত্যাগী, আল্লাহ ও রাসূলের বিশ্বাসঘাতক, জাহান্নামী ও অভিশপ্ত৷
৹ অন্তর্হিত ইমাম আত্মপ্রকাশ করার পর শায়খানকে কবর থেকে বের করবেন এবং হাজারবার শুলীতে চড়াবেন৷
৹ হযরত হাফসা ও আয়েশা মুনাফিক ছিলেন৷
৹ নবুওয়ত খতম হয়নি, উন্নত আকারে অব্যাহত রয়েছে৷
৹ পবিত্র কুরআনে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন হয়েছে৷
৹ পবিত্র কুরআনের দুই তৃতীয়াংশ গায়েব করে দেয়া হয়েছে৷
৹ আসল কুরআন হল যা হযরত আলী সংকলন করেছেন৷ তা অন্তর্হিত ইমামের নিকট আছে, যা বর্তমান কুরআন থেকে ভিন্ন৷
৹ তাওরাত ও ইনজিলের ন্যায় কুরআনে পরিবর্তন হয়েছে৷
৹ কুরআনের একটি সূরা বর্তমান কুরআনে নেই৷ সেই সূরার নাম হল সূরায়ে বেলায়েত৷
৹ পবিত্র কুরআন ত্রিশ পারা নয়, চল্লিশ পারা৷
৹ কাবা অপেক্ষা কারবালা শ্রেষ্ঠ৷
৹ মুতা বিবাহ কেবল জায়েয ও হালালই নয়; বরং নামায, রোযা, হজ্ব থেকেও উত্তম ইবাদত৷
৹ আকিদায়ে খতমে নবুওয়তের অস্বীকার৷
এ হল শিয়া সম্প্রদায়ের কুফরী আকিদা-বিশ্বাস৷
বর্তমান ইরানে সুন্নীদের করুন অবস্থা সম্পর্কে অনেকে ওয়াকিফহাল নন৷ যদিও ইরানী শিয়ারা বিভিন্ন মুসলিম দেশে ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক সহযোগিতা, সহানুভূতির বাণী প্রচার করে বেড়ায়৷ কিন্তু ইরানের অভ্যন্তরে সুন্নীদের চিত্র নিম্নরূপ৷
০ সুন্নীরা ইরানের নাগরিক হওয়া সত্তেও তাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত৷
০ রাজধানী তেহরানে সুন্নীদের পৃথক মসজিদ নির্মাণের অনুমতি দেয়া হয় না৷
০ সরকার নিয়ন্ত্রিত কোন মসজিদে সুন্নী আলেমকে ইমাম নিয়োগ দিতে রাজি নয়৷
০ ইরানে সুন্নীরা শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত৷

Thursday, February 25, 2016

অনলাইনে আপনার জন্ম নিবন্ধন ভেরিফাই ও নিবন্ধনের সহজ পদ্ধতি জেনে নিন

জন্ম নিবন্ধন করতে এখন আর আপনাকে ঝুক্কি-ঝামেলায় পড়তে হবে না। ঘরে বসে অনলাইনেই করতে পারবেন এই কাজটি। এখন অনলাইনে আপনার জন্ম নিবন্ধন ভেরিফাই করার সহজ পদ্ধতি জেনে নিন।



জন্ম নিবন্ধন করতে আপনাকে নানা হজিমতে পড়তে হতো। কখনও টাকার খরচা বাড়তো আবার কখনও টাকা দিয়েও ভুয়া জন্ম নিবন্ধন হওয়ার কারণে বেকায়দায় পড়তে হতো। কিন্তু এখন আর সেই ঝামেয়ায় পড়তে হবে না। এখন আর আপনাকে টাকার বিনিময়ে নাকি ভুয়া জন্ম নিবন্ধন বা Birth Certificate নিতে হবে না। সরকারি কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভুয়া জন্ম নিবন্ধন ব্যবহারে আপনাকে আর অযাচিত বিড়ম্বনার স্বীকার হতে হবে না। কোন প্রতিষ্ঠানে আপনার জন্ম নিববন্ধন সার্টিফিকেট ব্যবহার করার আগে, আপনি নিজেই যাচাই করে নিন আপনার জন্ম নিবন্ধন সার্টিফিকেট আসল, নাকি ভুয়া। অনলাইনে খুব সহজেই আপনি ভেরিফাই করে নিতে পারেন আপনার জন্মনিবন্ধন সার্টিফিকেটটি। আবার নতুন জন্ম নিবন্ধন ফর্ম সংগ্রহ করে, নতুন জন্ম নিবন্ধনের কাজটিও আপনি সারতে পারেন এই অনলাইনের মাধ্যমেই।
কিভাবে আপনি আপনার জন্ম নিবন্ধন সার্টিফিকেটটি ভেরিফাই করবেন:
প্রথমে http://bris.lgd.gov.bd/pub/?pg=verify_br (এলজিডি.গভ.বিডি)তে এ ক্লিক করতে হবে। এরপর নিচের মতো পেইজটি খুলবে। সেই ফর্মের যথাস্থানে আপনার জন্ম নিবন্ধন সার্টিফিকেট নম্বর এবং জন্ম তারিখ বসিয়ে ভেরিফাই বাটনে ক্লিক করুন-


আপনার জন্ম নিবন্ধন সার্টিফিকেটটি যদি আসল হয়, তাহলে ভেরিফাই বাটনে ক্লিক করার সঙ্গে সঙ্গে আপনি আপনার নাম ঠিকানাসহ সকল তথ্য দেখতে পারবেন।




আর যদি লাল রং এর হরফে লেখা Matching birth records not found দেখতে পান, তাহলে বুঝবেন আপনার জন্ম নিবন্ধন সার্টিফিকেটটি আসলে ভুয়া।





কিভাবে অনলাইনে জন্মনিবন্ধনের জন্য আবেদন করবেন ও আবেদনপত্র ফরম সংগ্রহ করবেন:
জন্ম নিবন্ধন আইন অনুযায়ী: জাতি-গোষ্ঠি, ধর্ম-কিংবা জাতীয়তা নির্বিশেষে বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী প্রত্যেকটি মানুষের জন্য জন্ম নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক। জন্ম নিবন্ধন প্রক্রিয়া শেষে জন্ম নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ নিবন্ধনকারীকে একটি সার্টিফিকেট প্রদান করবেন। জন্ম নিবন্ধন আইনের বিধান অনুযায়ী এই বিধি লঙ্ঘনকারী নিবন্ধক বা ব্যক্তি অনধিক ৫০০ (পাঁচ শত টাকা) অথবা অনধিক ২মাস বিনাশ্রম কারাদন্ডে বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারেন। অতএব সময় নষ্ট না করে নবজাত জন্মের সঙ্গে সঙ্গে জন্ম নিবন্ধিত করুন।
অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন এর আবেদন করতে হলে প্রথমে আবেদনপত্র ফরম সংগ্রহ করতে হবে। বিস্তারিত জানতে এই লিংকে ক্লিক করুন



Monday, February 22, 2016

চিরতরে বাড়ি থেকে দূর করুন, ইদুর,তেলাপোকা,মাছি,ছারপোকা,টিকটিকি ও মশা!!

নানা কারণে ঘর বাড়িতে পোকামাকড়ের উপদ্রব হয়। আর একবার কোন পোকা ঘরে বসবাস শুরু করলে তা আর সহজে যেতে চায় না। বিশেষ করে মশা, তেলাপোকা, ছারপোকা ইত্যাদি। আর বেশীরভাগ বাড়িতেই তো একেবারে ঘাঁটি গেড়ে বসে আছে প্রচুর পরিমাণে ইঁদুর এবং টিকটিকি। কিছু উপায় আছে যার মাধ্যমে খুব সহজে এবং ঘরোয়া উপায়ে এদের দূর করা সম্ভব। আসুন তাহলে জেনে নেওয়া যাক এসব উপদ্রব থেকে রক্ষার কিছু উপায়।
। ইঁদুর
ঘর বাড়ির খুব সাধারণ একটি সমস্যা হল ইঁদুর। এই ইঁদুর দূর করবে পেপারমেণ্ট। ইঁদুর পেপারমেণ্টের গন্ধ সহ্য করতে পারে না। একটি তুলোর বলে পেপারমেন্ট অয়েল ডুবিয়ে নিন। এবার তুলোর বলটি ইদুরের বাসার কাছে রেখে দিন। পেপারমেণ্টের গন্ধ শ্বাসযন্ত্রে প্রবেশ করে তাদের নিঃশ্বাস নেওয়া বন্ধ করে দিবে এবং তারা মারা যাবে।
। তেলাপোকা
তেলাপোকা নেই এমন বাড়ি খুঁজে পাওয়া ভার! রান্নার মশলা দিয়ে দূর করুন এই তেলাপোকা। কিভাবে? গোলমরিচ গুঁড়া, পেঁয়াজ, রসূন এবং পানি দিয়ে পেষ্ট তৈরি করে নিন। পেষ্ট কিছুটা তরল করে তৈরি করবেন। এবার এটি স্প্রের বোতলে ভরে রাখুন। যেখানে তেলাপোকা দেখবেন সেখানে স্প্রে করুন। দেখবেন তেলাপোকা পালিয়ে গেছে। শুধু তেলাপোকা না অন্যান্য পোকা মাকড়ের হাত থেকে আপনার ঘরকে রক্ষা করবে।
। মাছি
মাছি তাড়ানোর অনেক উপায় আছে। কিন্তু সবচেয়ে সহজ এবং কার্যকরী উপায় হল তুলসী পাতা। বারান্দায় বা জানলার কাছে একটি তুলসী গাছ রাখুন। দেখবেন মাছি আপনার বাসায় আসছে না। এছাড়া বিভিন্ন এ্যাসেন্সিয়াল অয়েল যেমন ল্যাভেন্ডার এবং ইউক্যালিপ্টাস অয়েল মাছি তাড়াতে অনেক বেশি কার্যকর।
। ছারপোকা
ছারপোকা দূর করতে পেঁয়াজের রস অনেক বেশি কার্যকরী। একটি স্প্রে বোতলে পেঁয়াজের রস ভরে নিন। তারপর এটি স্প্রে করে দিন বিছানা, সোফার চারপাশে যেখানে ছারপোকা রয়েছে।
। টিকটিকি
ঘরের আরেকটি উপদ্রব হল টিকটিকি। এই টিকটিকি হাত থেকে বাঁচার জন্য ঘরে কোণে বিশেষ করে ভেন্টিলেটরের কাছে ডিমের খালি খোসা ঝুলিয়ে রাখুন। ডিমের গন্ধ টিকটিকিকে দূরে রাখবে। তবে সেদ্ধ নয়, অবশ্যই কাঁচা ডিমের খোসা ঝোলাবেন। এছাড়াও ঘরে ময়ূরের পালক রাখতে পারেন। টিকটিকি ঘরের ত্রিসীমানায় ঘেঁষবে না।
। মশা
মশা তাড়ানোর জন্য কত রকমের স্প্রে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু মশা তাড়ানোর সবচেয়ে সহজ আর কার্যকরী উপায় হল নিমের তেলের ব্যবহার। প্রতিদিন শরীরে নিমের তেল ব্যবহার করুন। এটি আপনাকে মশা থেকে দূরে রাখবে এবং তার সাথে সাথে ত্বকও সুস্থ এবং ভালো রাখবে।

ফিকহে হানাফীঃ কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য --

মাওলানা মুহাম্মাদ যাকারিয়া আব্দুল্লাহ :


জীবনের অঙ্গন অতি বিস্তৃত এবং অতি বৈচিত্রময়। ইসলাম যেহেতু পূর্ণাঙ্গ দ্বীন তাই তা জীবনের সকল বৈচিত্রকে ধারণ করে। জীবনের সকল বিভাগ তাতে নিখুঁতভাবে সন্নিবেশিত। ইসলামী জীবন-দর্শনের পরিভাষায় মানব-জীবনের মৌলিক বিভাগগুলো নিম্নোক্ত শিরোনামে শ্রেণীবদ্ধ হয়েছে : ১. আকাইদ (বিশ্বাস), ২. ইবাদাত (বন্দেগী ও উপাসনা), ৩. মুআমালাত (লেনদেন), ৪. মুআশারাত (পারিবারিক ও সামাজিক নীতি এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা) ও ৫. আখলাক (চরিত্র, আচরণ ও নৈতিকতা)। বলাবাহুল্য যে, প্রতিটি বিষয়ের অধীনে প্রচুরসংখ্যক মৌলিক শিরোনাম ছাড়াও রয়েছে প্রাসঙ্গিক বহু বিষয়। আমাদের সামনে হাদীস ও ফিকহের বহু বিষয়ভিত্তিক সংকলন বিদ্যমান রয়েছে। এসব গ্রন্থের সূচিপত্রে নজর বুলালে উপরোক্ত প্রতিটি বিষয়ের ব্যাপকতা অনুমান করা যাবে। ইসলামের অনন্য বৈশিষ্ট্য এই যে, তার মৌলিক দুই সূত্র-কুরআন ও সুন্নাহ সম্পূর্ণ সুরক্ষিত।

পূর্ণ কুরআন মজীদ এবং হাদীস ও সুন্নাহ্‌র উল্লেখযোগ্য অংশ ‘তাওয়াতুরে’র মাধ্যমে এসেছে। হাদীস ও সুন্নাহর অপর অংশটিও এসেছে ‘রেওয়ায়েত’ ও ‘আমলে’র নির্ভরযোগ্য সূত্রে। হাদীসের মৌলিক গ্রন্থসমূহে প্রতিটি হাদীস সনদসহ সংকলিত হয়েছে। এতে যেমন রয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী ও কর্ম তেমনি রয়েছে মুজতাহিদ সাহাবা ও তাবেয়ী ইমামগণের ফতোয়া ও আমলের বিবরণ। পরবর্তী যুগের মুজতাহিদ ইমামগণের ফতোয়া ও আমলও ফিকহের মৌলিক গ্রন্থসমূহে বিদ্যমান রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে মুসলিম উম্মাহকে দুটি মহান জামাতের ঋণ স্বীকার করতে হবে। তাঁরা হলেন আইম্মায়ে হাদীস ও আইম্মায়ে ফিকহ। হাদীসের ইমামগণ যেমন হাদীস ও আছারকে সূত্রসহ সংরক্ষণ করেছেন তেমনি ফিকহের ইমামগণ সংরক্ষণ করেছেন হাদীসের মর্ম ও আমলের ধারাবাহিকতা।
বর্ণনা ও রেওয়ায়েতের শুদ্ধাশুদ্ধির বিষয়ে আমরা যেমন হাদীস-শাস্ত্রের মুজতাহিদ ইমামগণের মুখাপেক্ষী তেমনি হাদীস ও সুন্নাহর যথার্থ অনুসরণের ক্ষেত্রে ফিকহের ইমামগণের উপর নির্ভরশীল। আপনি যে বিষয়েরই হাদীস অধ্যয়ন করুন, তা ইমামগণের পরীক্ষা নিরীক্ষার পর সংকলিত হয়েছে এবং আজ আমরা তা পাঠ করে ধন্য হচ্ছি। অতএব হাদীসকে হাদীস হিসাবে জানার ক্ষেত্রে আমরা হাদীস-শাস্ত্রের মুজতাহিদ ইমামগণের মুকাল্লিদ। তদ্রূপ কুরআন-সুন্নাহ থেকে হালাল-হারামের বিধান, ইবাদতের সঠিক নিয়ম-কানুন, হুকুক ও অধিকার ইত্যাদি সঠিকভাবে জানার ক্ষেত্রে ফিকহ-শাস্ত্রের মুজতাহিদ ইমামগণের অনুসারী। এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করার জন্য একটি মৌলিক বিষয় বুঝে নেওয়া দরকার। তা এই যে, কুরআন-সুন্নাহর উপরোক্ত সকল নির্দেশনা মৌলিক দুই ভাগে বিভক্ত : ১. যা অনুধাবনে ইজতিহাদী পর্যায়ের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অপরিহার্য। ২. যা অনুধাবনে ইজতিহাদী পর্যায়ের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অপরিহার্য নয়।
প্রথম শ্রেণীর নির্দেশনাগুলো মূলত ‘আহকাম’ বিষয়ক। ‘আহকাম’ অর্থ হালাল-হারাম, জায়েয-না জায়েয এবং কর্তব্য ও কর্মপদ্ধতি বিষয়ক বিধান। দ্বিতীয় শ্রেণীর নির্দেশনাগুলো মূলত বিশ্বাস ও চেতনা এবং চরিত্র ও নৈতিকতার সঙ্গে সম্পৃক্ত, যা মানুষকে আখিরাতের চেতনায় উজ্জীবিত করে এবং ঈমান ও ইয়াকীনে সমৃদ্ধ করে। পাশাপাশি তা উন্নত মানবিক বোধ জাগ্রত করে এবং উত্তম হৃদয়-বৃত্তির অধিকারী করে। সর্বোপরি তা দান করে জীবন-যাপনের আদর্শ নীতিমালা। এই বিষয়বস্তুগত পার্থক্য অনুধাবনের জন্য আমরা কুরআন মজীদের মক্কী ও মাদানী সূরাগুলি তুলনা করে পাঠ করতে পারি। মক্কী সূরা বলতে বোঝানো হয় যে সূরাগুলি হিজরতের আগে অবতীর্ণ হয়েছে, আর মাদানী সূরা অর্থ যা হিজরতের পর অবতীর্ণ হয়েছে। এদের মধ্যে বিষয়বস্তুগত মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। মক্কী সূরাগুলোতে বিশ্বাস, চেতনা ও নীতি-নৈতিকতাই প্রধান। পক্ষান্তরে মাদানী সূরাসমূহে হুকুক ও আহকামের প্রাধান্য। হাদীস শরীফের ক্ষেত্রেও এই পার্থক্য অনুধাবন করা কঠিন নয়। তবে হাদীস শরীফের মৌলিক গ্রন্থসমূহে অর্থাৎ ‘মাসানীদ’, ‘জাওয়ামি’, ‘মা‘আজিম’, ‘সুনান’ ইত্যাদিতে উভয় ধরনের হাদীস সংকলিত হয়েছে। ‘সুনান’ গ্রন্থসমূহে আহাদীসে আহকাম বিশেষভাবে সংকলিত হলেও অন্যান্য প্রসঙ্গও তাতে সন্থান পেয়েছে। এই উৎস-গ্রন্থসমূহ থেকে আলিমগণ বহু ধরনের হাদীস-গ্রন্থ সংকলন করেছেন। পাঠক যদি মুনযিরীর ‘আত-তারগীব ওয়াত তারহীব’ ও নববীর ‘রিয়াযুস সালেহীন’কে হাফেয যায়লায়ীর ‘নাসবুর রায়াহ’ ও হাফেয ইবনে হাজার আসকালানীর ‘আলতালখীসুল হাবীরে’র সঙ্গে তুলনা করেন তাহলে উপরোক্ত দুই শ্রেণীর হাদীসের বিষয়বস্তুগত পার্থক্য তাদের সামনে পরিষ্কার হয়ে যাবে।
এরপরের পর্যায়টি বেশ কঠিন। তা হচ্ছে হুকুক ও আহকাম বিষয়ক আয়াত ও হাদীস সম্পর্কে মুজতাহিদ ইমামগণের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা। এটা করতে সক্ষম হলে স্পষ্ট হবে যে, কুরআন-সুন্নাহর এই অংশটি প্রকৃতপক্ষেই ইজতিহাদের ক্ষেত্র। এই দীর্ঘ আলোচনার উদ্দেশ্য হচ্ছে ইজতিহাদ ও তাকলীদের ক্ষেত্র চিহ্নিত করা। আশা করি উপরের আলোচনায় পরিষ্কার হয়েছে যে, কুরআন-সুন্নাহর আহকাম শ্রেণীর নির্দেশনাগুলোই মৌলিকভাবে ইজতিহাদ ও তাকলীদের ক্ষেত্র। এগুলো ছাড়া অন্যান্য বিষয়ের ফলপ্রসূ অধ্যয়নের জন্য দ্বীনের সঠিক রুচি ও বিষয়বস্তু সঠিকভাবে অনুধাবনের যোগ্যতা থাকাই যথেষ্ট। এজন্য হক্কানী উলামা-মাশায়েখের সোহবতের দ্বারা সঠিক দ্বীনী রুচি অর্জনের পর সাধারণ পাঠকও কুরআন-সুন্নাহ্‌র এই অংশ সরাসরি অধ্যয়ন করতে পারেন এবং তা থেকে দ্বীনী চেতনা আহরণ করতে পারেন।
পক্ষান্তরে আহকাম বিষয়ক অধিকাংশ নির্দেশনা সরাসরি কুরআন-সুন্নাহ থেকে বোঝার জন্য ইজতিহাদী পর্যায়ের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অপরিহার্য। তাই তা অনুসরণের শরীয়তসম্মত পন্থা হচ্ছে : ১. যিনি ইজতিহাদের যোগ্যতার অধিকারী তিনি ইজতিহাদের ভিত্তিতে আমল করবেন। ২. যার ইজতিহাদের যোগ্যতা নেই তিনি মুজতাহিদের তাকলীদ করবেন। এটিই হচ্ছে কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণের কুরআন-সুন্নাহসম্মত পন্থা। পক্ষান্তরে তৃতীয় পদ্ধতি, অর্থাৎ ইজতিহাদের যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও ইজতিহাদের প্রচেষ্টা কিংবা ইজতিহাদের যোগ্যতাহীন লোকের অনুসরণ, দু’টোই শরীয়তের দৃষ্টিতে প্রত্যাখ্যাত। এই ভূমিকাটুকুর পর এবার আমরা মূল আলোচনায় প্রবেশ করছি ।
শিরোনামে ‘ফিকহ’ শব্দটি উল্লেখিত হয়েছে। কুরআন-সুন্নাহ্‌য় উল্লেখিত হুকুম-আহকাম এবং পরবর্তীতে উদ্ভূত নানাবিধ সমস্যার কুরআন-সুন্নাহ্‌ভিত্তিক সমাধানের সুসংকলিত রূপকেই পরিভাষায় ফিকহ বলা হয়। যে ইমামগণ তা আহরণ করেছেন তাদের সঙ্গে সম্বন্ধ করে এর বিভিন্ন নাম হয়েছে। যেমন ফিকহে হানাফী, ফিকহে মালেকী, ফিকহে শাফেয়ী ও ফিকহে হাম্বলী। এই সব ফিকহের, বিশেষত ফিকহে হানাফীর কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য আলোচনা করা এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য।

প্রথম বৈশিষ্ট্য : কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক আমল করার স্বীকৃত পদ্ধতি-
ফিকহে হানাফী ও অন্যান্য ফিকহের প্রথম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তা কুরআন-সুন্নাহ অনুসরণের স্বীকৃত ও সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি। চার মুজতাহিদ ইমামের ইজতিহাদী যোগ্যতা এবং তাঁদের সংকলিত ফিকহের নির্ভরযোগ্যতার বিষয়ে গোটা মুসলিম উম্মাহ একমত। সর্বযুগের আলিমগণের স্বীকৃতি ও অনুসরণের দ্বারা এই সত্য সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লামা ইবনুল উযীর (মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম) ইয়ামানী (মৃত্যু : ৮৪০ হি.) বলেন, ‘তাঁর (ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর) মুজতাহিদ হওয়ার বিষয়ে (মুসলিম উম্মাহর) ইজমা রয়েছে। কেননা, ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর মতামতসমূহ তাবেয়ী যুগ থেকে আজ নবম হিজরী পর্যন্ত গোটা মুসলিম জাহানে সর্বজনবিদিত। যারা তা বর্ণনা করেন এবং যারা অনুসরণ করেন কারো উপরই আপত্তি করা হয়নি। এ প্রসঙ্গে মুসলিম উম্মাহর (আলিমগণের) অবস্থান হল, তাঁরা হয়তো সরাসরি তার অনুসরণ করেছেন, কিংবা অনুসরণকারীদের উপর আপত্তি করা থেকে বিরত থেকেছেন। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রে এভাবেই ইজমা সম্পন্ন হয়ে থাকে।’ তিনি আরো বলেন, ‘বহু মনীষী আলিম পরিষ্কার বলেছেন যে, মুজতাহিদ যখন ফতোয়া দান করেন এবং সাধারণ মানুষ তার অনুসরণ করে তখন সমসাময়িক আলিমগণ আপত্তি না করলে প্রমাণ হয় যে, তিনি প্রকৃতপক্ষেই মুজতাহিদ। (পরবর্তী যুগের) আলিমদের জন্য যদি এ নীতি প্রযোজ্য হয় তাহলে তাবেয়ী যুগের কথা তো বলাই বাহুল্য। কেননা, তা ছিল জগদ্বিখ্যাত মনীষীদের যুগ। আর ইমাম আবু হানীফা রাহ. তাঁদেরই সমসাময়িক ছিলেন।’-আর রওযুল বাছিম, মাকানাতুল ইমাম আবী হানীফা ফিল হাদীস পৃ. ১৬৪-১৬৫ এ বিষয়টি শুধু ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর ক্ষেত্রেই নয়, তাঁর মনীষী সঙ্গীদের ক্ষেত্রে এবং অন্য তিন ইমামের ক্ষেত্রেও সমান সত্য। আলোচনা দীর্ঘ হওয়ার আশংকা না হলে এখানে মুসলিম জাহানের ওইসব মনীষীর একটি তালিকা উল্লেখ করা যেত, যাঁরা হাদীস-শাস্ত্রের শীর্ষস্থানীয় মুজতাহিদ হওয়া সত্ত্বেও ফিকহের ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানীফা রা.-এর মতামত অনুসরণ করেছেন।

দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য : কুরআন-সুন্নাহর আহকাম ও ফিকহুস সালাফের উত্তম সংকলন--

এ কথা বলাই বাহুল্য যে, ফিকহে হানাফী কুরআন-সুন্নাহ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। উপরের আলোচনা থেকেও তা বোঝা যায়। ফিকহে হানাফীর সকল সিদ্ধান্ত কুরআন-সুন্নাহ ও আছারে সাহাবার ভিত্তিতে প্রমাণিত। ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর ফিকহ-সংকলনের নীতিমালা সম্পর্কে যাদের ধারণা রয়েছে তাদের এ বিষয়ে কোনো সংশয় থাকার কথা নয়। এ প্রসঙ্গে আমি উস্তাদে মুহতারাম হযরত মাওলানা আবদুল মালেক ছাহেব দামাত বারাকাতুহুমের একটি মূল্যবান প্রবন্ধ থেকে কিছু অংশ তুলে দিচ্ছি : ‘ফিকহে মুতাওয়ারাছ’ (ফিকহের যে অংশ নবী-যুগ থেকে চলে আসছে) সংকলন এবং সাহাবা ও শীর্ষস্থানীয় তাবেয়ীগণের যুগ শেষ হওয়ার পর উদ্ভূত নতুন সমস্যাবলির সমাধানের জন্য ইমাম আবু হানীফা রাহ.কে কী কী কাজ করতে হয়েছিল এবং এ বিষয়ে তাঁর কী কী অবদান রয়েছে-এ সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে গ্রন্থ রচনা করতে হবে। তাই আমি এখানে তাঁর নিজের ভাষায় শুধু এ বিষয়টি উল্লেখ করতে চাই যে, ফিকহ ও ফতোয়ার বিষয়ে তাঁর মৌলিক নীতিমালা কী ছিল। ‘এ প্রসঙ্গে বিভিন্ন সহীহ সনদে ইমাম আবু হানীফা রাহ. থেকে যে নীতিমালা উল্লেখিত হয়েছে তার সারকথা এই- ১. মাসআলার সমাধান যখন কিতাবুল্লাহ্‌য় পাই তখন সেখান থেকেই সমাধান গ্রহণ করি। ২. সেখানে না পেলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহ এবং সহীহ হাদীস থেকে গ্রহণ করি, যা নির্ভরযোগ্য রাবীদের মাধ্যমে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। সহীহ হাদীস আমাদের জন্য শিরোধার্য। একে পরিত্যাগ করে অন্য কিছুর শরণাপন্ন হওয়ার প্রশ্নই আসে না। ৩. এখানেও যদি না পাই তবে সাহাবায়ে কেরামের সিদ্ধান্তের শরণাপন্ন হই। ৪. কিতাবুল্লাহ, সুন্নাতু রাসূলিল্লাহ ও ইজমায়ে সাহাবার সামনে কিয়াস চলতে পারে না। তবে যে বিষয়ে সাহাবীগণের একাধিক মত রয়েছে সেখানে ইজতিহাদের মাধ্যমে যার মত কিতাব-সুন্নাহ্‌র অধিক নিকটবর্তী বলে মনে হয় তা-ই গ্রহণ করি। ৫. মাসআলার সমাধান এখানেও পাওয়া না গেলে ইজতিহাদের মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছে থাকি। তবে এক্ষেত্রেও তাবেয়ীগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত থেকে বিচ্ছিন্ন হই না।-আলইনতিকা ফী ফাযাইলিল আইম্মাতিছ ছালাছাতিল ফুকাহা, ইবনে আবদিল বার পৃ. ২৬১, ২৬২, ২৬৭; ফাযাইলু আবী হানীফা, আবুল কাসিম ইবনু আবিল ‘আওয়াম পৃ. ২১-২৩ মাখতূত; আখবারু আবী হানীফা ওয়া আসহাবিহী, আবু আবদুল্লাহ আসসাইমারী (মৃত্যু : ৪৩৬ হি.) পৃ. ১০-১৩; তারীখে বাগদাদ, খতীবে বাগদাদী ১৩/৩৬৮; উকূদূল জুমান, মুহাম্মাদ ইবনে ইউসুফ সালিহী পৃ. ১৭২-১৭৭; মানাকিবুল ইমাম আবী হানীফা, মুয়াফফাক আলমাক্কী ১/৭৪-১০০ ‘ফিকহে মুতাওয়ারাছ সংকলন এবং ‘ফিকহে জাদীদ’ আহরণের যে নীতিমালা ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর নিজের ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে তা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর সকল ইমামের সর্বসম্মত নীতি। কোনো ফিকহ তখনই ইসলামী ফিকহ হতে পারে যখন তা উপরোক্ত নীতিমালার ভিত্তিতে সংকলিত ও আহরিত হয়। ‘ফিকহ-সংকলন এবং ফিকহ-আহরণের ক্ষেত্রে উপরোক্ত নীতিমালা অনুসরণে তিনি কতটুকু সফল হয়েছেন তা তাঁর সমসাময়িক তাফসীর, হাদীস, ফিকহ ইত্যাদি সকল ইসলামী শাস্ত্রের স্বীকৃত ইমামগণের বক্তব্য থেকে জানা যেতে পারে। ইমাম সুফিয়ান ছাওরী রাহ. (মৃত্যু : ১৬১ হি.) বলেন, ‘আবু হানীফা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ইলম অন্বেষণ করেছেন। তিনি ছিলেন (দ্বীনের প্রহরী) দ্বীনের সীমানা রক্ষাকারী, যাতে আল্লাহর হারামকৃত কোনো বিষয়কে হালাল মনে করা না হয়, কিংবা হালালের মতো তাতে লিপ্ত থাকা না হয়। যে হাদীসগুলো তার কাছে সহীহ সাব্যস্ত হত, অর্থাৎ যা নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিগণ বর্ণনা করে এসেছেন, তার উপর তিনি আমল করতেন এবং সর্ববিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শেষ আমলকে গ্রহণ করতেন। কুফার আলিমগণকে যে আমল ও ধারার উপর প্রতিষ্টিত দেখেছেন তিনিও তা থেকে বিচ্যুত হননি (কেননা, এটাই ছিল সাহাবা যুগ থেকে চলমান আমল ও ধারা)।-আলইনতিক্বা, ইবনে আবদিল বার পৃ. ২৬২; ফাযাইলু আবী হানাফী, ইবনু আবিল ‘আওয়াম পৃ.. ২২ (মাখতূত)। ‘... এজন্য হাদীস শাস্ত্রের সর্বজনস্বীকৃত মনীষী ইমাম আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহ. (১৮১ হি.) বলেছেন, ‘আবু হানীফার ফিকহকে নিছক রায় (মত) বলো না। প্রকৃতপক্ষে তা হচ্ছে হাদীসের ব্যাখ্যা।’-ফাযাইলু আবী হানীফা,, ইবনু আবিল ‘আওয়াম পৃ. ২৩’’ (ফিকহে হানাফীর সনদ, মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক, মাসিক আলকাউসার জুলাই ’০৭ পৃ. ৯) যোগ্য ব্যক্তির জন্য সরাসরি পরীক্ষা করে দেখারও সুযোগ রয়েছে। হাফেয যায়লায়ী রাহ. (৭৬২ হি.) কৃত ‘নসবুর রায়া ফী তাখরীজি আহদীছিল হিদায়া’ গ্রনে'র ভূমিকায় আল্লামা যাহিদ কাওছারী রাহ. লেখেন, ‘পাঠক যদি এই গ্রনে'র পৃষ্ঠা ওল্টাতে থাকেন এবং বিভিন্ন অধ্যায়ে সংকলিত হাদীসগুলো পাঠ করেন তাহলে তার প্রত্যয় হবে যে, হানাফী মনীষীগণ শরীয়তের সকল বিষয়ে হাদীস ও আছারের নিষ্ঠাবান অনুসারী।’ (ভূমিকা, নাসবুর রায়াহ পৃষ্ঠা : ১৯) ইমাম আবদুল ওয়াহহাব আশশা’রানী রাহ. (৮৯৮-৯৭৩ হি.) বলেন, ‘আমি যখন (চার) মাযহাবের দলীল বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করেছি তখন, আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া যে, ইমাম আবু হানীফা রাহ. ও তাঁর সঙ্গীদের মতামত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ হয়েছে। আমি লক্ষ করেছি যে, তাঁদের সিদ্ধান-গুলোর সূত্র হচ্ছে কুরআন মজীদের আয়াত, (সহীহ) হাদীস ও আছার অথবা তার মাফহুম, কিংবা এমন কোনো হাদীস, যার একটি সনদ যয়ীফ হলেও মূল হাদীস একাধিক সনদে বর্ণিত, অথবা নির্ভরযোগ্য উসূলের উপর কৃত কিয়াসে সহীহ।’-আলমীযান পৃ. ৫২; আবু হানীফা ওয়া আসহাবুহুল মুহাদ্দিসূন পৃ. ৬১

তৃতীয় বৈশিষ্ট্য : শূরাভিত্তিক সংকলন :
ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর একটি বিশেষত্ব এই যে, তিনি ছিলেন সঙ্গী-সৌভাগ্যে অতি সৌভাগ্যবান। সমকালীন শ্রেষ্ঠ মনীষার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তাঁর সঙ্গে ছিল। কুরআন-সুন্নাহ, হাদীস, আছার, ফিকহ, ইজতিহাদ, যুহদ ও আরাবিয়্যাতের দিকপাল মনীষীরা ছিলেন তাঁর শীষ্য। এঁদের সম্মিলিত আলোচনা ও পর্যালোচনার দ্বারা ফিকহে হানাফী সংকলিত হয়েছে। সমকালীন হাদীস ও ফিকহের বিখ্যাত ইমামগণও ফিকহে হানাফীর এই বৈশিষ্ট্য সর্ম্পকে সচেতন ছিলেন। কুফা নগরীর বিখ্যাত মনীষী ইমাম সুলায়মান ইবনে মিহরান আমাশ রাহ. (১৪৮ হি.) কে এক ব্যক্তি মাসআলা জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি তখন (ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর মজলিসের দিকে ইঙ্গিত করে) বললেন, এঁদের জিজ্ঞাসা করুন। কেননা, এঁদের নিকট যখন কোনো প্রশ্ন উত্থাপিত হয় তখন তারা সম্মিলিতভাবে মতবিনিময় করেন এবং (সর্বদিক পর্যালোচনার পর) সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হন।’-জামিউল মাসানীদ, আবুল মুআইয়াদ খুয়ারাযমী ১/২৭-২৮ ইবনে কারামাহ বলেন, ‘আমরা একদিন ওকী ইবনুল জাররাহ রাহ. এর মজলিসে ছিলাম। জনৈক ব্যক্তি কোনো বিষয়ে বললেন, ‘আবু হানীফা এখানে ভুল করেছেন।’ ওকী বললেন, আবু হানীফা কীভাবে ভুল করতে পারেন, তাঁর সঙ্গে রয়েছেন আবু ইউসুফ, যুফার ইবনুল হুযাইল ও মুহাম্মাদ ইবনুল হাসানের মতো ফকীহ ও মুজতাহিদ, হিব্বান ও মানদালের মতো হাফিযুল হাদীস, কাসিম ইবনে মা’ন-এর মতো আরাবিয়্যাতের ইমাম এবং দাউদ ইবনে নুছাইর ত্বয়ী ও ফুযাইল ইবনে ইয়াযের মতো আবিদ ও যাহিদ? এই পর্যায়ের সঙ্গী যাঁর রয়েছে তিনি ভুল করবেন কীভাবে? কখনো যদি তাঁর ভুল হয় তবে তো এঁরাই তাকে ফিরিয়ে আনবেন।’-প্রাগুক্ত পৃ. ৩৩ ইমাম আসাদ ইবনুল ফুরাত রাহ. (২১৩ হি.) বলেন, ‘ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর চল্লিশজন সঙ্গী গ্রন্থসমূহ (ফিকহে হানাফী) সংকলন করেছেন। তাঁদের শীর্ষ দশজনের মধ্যে ছিলেন আবু ইউসুফ, যুফার, দাউদ ত্বয়ী, আসাদ ইবনে আমর, ইউসুফ ইবনে খালিদ ও ইয়াহইয়া ইবনে যাকারিয়া ইবনে আবী যাইদা। শেষোক্ত জন সিদ্ধান-সমূহ লিপিবদ্ধ করতেন। দীর্ঘ ত্রিশ বছর তিনি এই দায়িত্ব পালন করেছেন।’-ইবনু আবিল ‘আওয়াম-এর সূত্রে যাহিদ হাসান কাওছারী-ভূমিকা, নসবূর রায়াহ ১/৩৮

চতুর্থ বৈশিষ্ট্য : অবিরাম আলোচনা ও পর্যালোচনা দ্বারা সুসংহত


ইতিহাসের বাস্তবতা এই যে, চার ইমামের সমকালে মুসলিম-জাহানে অনেক অগ্রগণ্য মুজতাহিদ বিদ্যমান ছিলেন। নিজ নিজ অঞ্চলে তাঁদের তাকলীদও হয়েছে। কিন্তু চার ইমামের বৈশিষ্ট্য এই যে, মনীষী সঙ্গীগণ তাঁদের মতামতকে সংরক্ষণ করেছেন এবং আলোচনা ও পর্যালোচনা দ্বারা সুসংহত করেছেন, যা অন্যদের বেলায় হয়নি। বস্তুত চার মাযহাবের দীর্ঘায়ু ও বিপুল বিস্তারের এটি অন্যতম প্রধান কারণ। আল্লামা ইবনুল কাইয়িম রাহ.-এর একটি পরিসংখ্যান থেকে তা অনুমান করা যাবে। তিনি ‘ইলামুল মুয়াক্কিয়ীন’ গ্রন্থে মুসলিম জাহানের বিভিন্ন ভূখণ্ডের ফকীহ ও মুজতাহিদদের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা ‘তবাকা’ অনুসারে উল্লেখ করেছেন। এতে কুফা, শাম, মিসর প্রভৃতি বিখ্যাত কেন্দ্রের আলোচনা এসেছে। কুফা নগরীর আলোচনায় ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর সমসাময়িক সাতজন ফকীহর নাম উল্লেখ করেছেন। তাঁরা হলেন, মুহাম্মাদ ইবনে আবদুর রহমান ইবনে আবী লায়লা, আবদুল্লাহ ইবনে শুবরুমা, সায়ীদ ইবনে আশওয়া, শরীক ইবনে আবদুল্লাহ, কাসিম ইবনে মা’ন, সুফিয়ান ছাওরী ও হাসান ইবনে হাই। পরবর্তী তবাকায় উল্লেখিত হয়েছেন সর্বমোট ১৪ জন। লক্ষ্যণীয় বিষয় এই যে, এঁদের মধ্যে ৮ জনই ‘আসহাবু আবু হানীফা’ শিরোনামে। পক্ষান-রে সুফিয়ান ছাওরী ও হাসান ইবনে হাই রাহ. প্রত্যেকের ২ জন করে সঙ্গীর নাম উল্লেখিত হয়েছে। অবশিষ্ট দু’জন হলেন, হাফছ ইবন গিয়াছ ও ওকী ইবনুল জাররাহ। (ইলামুল মুয়াককিয়ীন ১/২৬) উল্লেখ্য, ইবনুল কাইয়িম রাহ. এ দু’জনকে আলাদাভাবে উল্লেখ করলেও প্রকৃতপক্ষে তাঁরাও ‘আসহাবু আবী হানীফা’র অন্তর্ভুক্ত। তদ্রূপ ইমাম আবু হানীফার সমসাময়িকদের মধ্যে কাসিম ইবনে মা’নকে আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ তিনিও ইমাম আবু হানীফার সঙ্গী এবং ফিকহে হানাফীর অন্যতম ইমাম। অন্য ফকীহদের কোনো শাগরিদ এই তবাকায় উল্লেখিত হননি। এ থেকে ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর মনীষী শীষ্যদের প্রাচুর্য সম্পর্কে অনুমান করা যায়। ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর মাঝে ব্যক্তিত্ব তৈরির অতুলনীয় যোগ্যতা ছিল। তাই তাঁর সোহবত ও তরবিয়ত থেকে ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম যুফার ইবনুল হুযাইল, ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান প্রমুখ মুজতাহিদ তৈরি হয়েছেন। পরবর্তীতে এই বৈশিষ্ট্য তাঁর শীষ্যদের মাঝেও বিকশিত হয়েছিল। সম্ভবত একটি দৃষ্টান্তই এক্ষেত্রে যথেষ্ট হবে যে, ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান রাহ.-এর সোহবত থেকে তৈরি হয়েছেন ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইদরীস আশশাফেয়ী। স্বয়ং ইমাম শাফেয়ী রাহ. তা কৃতার্থ চিত্তে স্মরণ করতেন। তিনি বলতেন ‘ফিকহ ও ইজতিহাদের ক্ষেত্রে আমার প্রতি সর্বাধিক অনুগ্রহ করেছেন মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান।’ (তারীখে বাগদাদ ২/১৭৬) তিনি আরো বলেছেন, ‘ফিকহ ও ইজতিহাদের ক্ষেত্রে সকল মানুষ (ইমাম) আবু হানীফার কাছে দায়বদ্ধ।’ (তারীখে বাগদাদ ১৩/৩৪৬) তাই প্রতি যুগেই যোগ্য পূর্বসূরী থেকে যোগ্য উত্তরসূরী পয়দা হয়েছেন এবং কখনো ফিকহে হানাফীর ধারক ও বাহকের অভাব হয়নি। পঠন-পাঠন এবং ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মাধ্যমে তা উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ হয়েছে। মূল আলোচনায় ফিরে আসি। কুফা নগরীর পর ইবনুল কাইয়্যিম রাহ. শামের মুজতাহিদ ইমামদের তালিকা উল্লেখ করেছেন। এতে যাঁদের নাম এসেছে তারা হলেন : ইয়াহইয়া ইবনে হামযা, আবু আম্‌র আবদুর রহমান ইবনে আম্‌র আওযায়ী, ইসমাইল ইবনে আবিল মুহাজির, সুলায়মান ইবনে মূসা উমাভী ও সায়ীদ ইবনে আবদুল আযীয রাহ.। পরবর্তী তবাকায় ‘ছাহিবুল আওযায়ী’ উপাধী শুধু একজনের নামের সঙ্গেই দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ আব্বাস ইবনে ইয়াযীদ ছাহিবুল আওযায়ী। (ইলামুল মুয়াক্কিয়ীন ১/২৭) ইমাম আওযায়ী রা. ছিলেন মুসলিম জাহানের বিখ্যাত মুজতাহিদদের অন্যতম। কিন্তু যোগ্য উত্তরসূরীর অভাবে তাঁর মাযহাব দীর্ঘায়ূ হয়নি। ফিকহের ইতিহাস লেখকরা বলেন, শাম ও আন্দালুসে ইমাম আওযায়ী রাহ. (১৫৭ হি.)-এর মাযহাব প্রচারিত হয়েছিল, কিন্তু হিজরী তৃতীয় শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত তা বিলুপ্ত হয়ে যায়। এখন শুধু ফিকহে মুকারান অর্থাৎ তুলনামূলক ফিকহের গ্রন্থাদিতে তাঁর মতামত পাওয়া যায়। মিসরের মুজতাহিদ ইমামদের মধ্যে উল্লেখিত হয়েছেন-আমর ইবনুল হারিছ, লাইছ ইবনে সা’দ ও উবাইদুল্লাহ ইবনে আবু জা’ফর। পরবর্তী তবাকা সম্পর্কে ইবনুল কাইয়েম রাহ.-এর বক্তব্য-‘এঁদের পর (মিসরের মুফতী ও মুজতাহিদ হলেন) ইমাম মালিক রাহ.-এর ‘আসহাব’ যেমন, আবদুল্লাহ ইবনে ওয়াহব, উছমান ইবনে কিনানা, আশহাব ও ইবনুল কাসিম রাহ.। এঁদের পর ইমাম শাফেয়ী রাহ.-এর ‘আসহাব’ যেমন, মুযানী, বুওয়াইতী ও ইবনু আব্দিল হাকাম। এরপর (সে অঞ্চলে) ব্যাপকভাবে ইমাম মালিক রাহ. ও ইমাম শাফেয়ী রাহ.-এর তাকলীদ হতে থাকে। কিছু মনীষী ব্যতিক্রম ছিলেন, যাঁদের নিজস্ব মতামত ছিল। যেমন মুহাম্মাদ ইবনে আলী ইবনে ইউসুফ ও আবু জা’ফর তহাবী।’(ই’লামুল মুয়াককিয়ীন ১/২৭) মিসরের বিখ্যাত মুজতাহিদ ইমাম লাইছ ইবনে সা’দ রহ. সম্পর্কে ইমাম শাফেয়ী রাহ. বলেছেন যে, ‘তিনি ফিকহ ও ইজতিহাদের ক্ষেত্রে ইমাম মালিকের চেয়েও অগ্রগামী ছিলেন, কিন্তু সঙ্গীগণ তাঁর মতামত সংরক্ষণ করেনি।’ (তাযকিরাতুল হুফফায ১/২২৪) এই সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান থেকে অনুমান করা কঠিন নয় যে, চার মাযহাবের প্রচার ও সংহতির পিছনের যোগ্য ধারক ও বাহকদের অবদান অনস্বীকার্য। হাফেয আবদুল কাদের আলকুরাশী রাহ. (৬৯৬-৭৭৫ হি.) এর একটি বিবরণ উল্লেখ করে এই আলোচনা সমাপ্ত করব। ফিকহে হানাফীর মনীষীদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি সম্পর্কে তাঁর গ্রন্থ ‘আলজাওয়াহিরুল মুযিয়্যা’র ভূমিকায় তিনি লেখেন, অন্যান্য মাযহাবের অনুসারীগণ তাঁদের মনীষীদের উপর স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেছেন। কিন্তু আমাদের কাউকে হানাফী মনীষীদের জীবনী সংকলন করতে দেখিনি। অথচ (তা একটি দীর্ঘ গ্রন্থের বিষয়বস্তু। কেননা, বিভিন্ন ভূখণ্ডের) হানাফী মনীষীদের সংখ্যা এত প্রচুর যে, তা গণনা করে শেষ করা যায় না। (কয়েকটি দৃষ্টান- দেখুন : ইমাম বুরহানুদ্দীন যারনুজী লিখিত) ‘কিতাবুত তা’লীম’-এ বলা হয়েছে যে, ইমাম আবু হানীফা রাহ. থেকে যে মনীষীগণ তাঁর ফিকহ বর্ণনা করেছেন তাদের সংখ্যা প্রায় চার হাজার। আর বলা বাহুল্য যে, তাঁদের প্রত্যেকের ছিল বহু সঙ্গী, যারা ওই ইলম ও ফিকহকে ধারণ করেছেন। ইমাম সামআনী বলেন, বুখারার খাইযাখাযা শহরে ইমাম আবু হাফস আলকাবীরের এত শাগরিদ রয়েছেন যে, গণনা করে শেষ করা যায় না। লক্ষ্য করুন, এটি বুখারার একটি মাত্র এলাকার কথা। ইমাম কুদূরী রাহ.-এর আলোচনায় বলেন, তিনি বিখ্যাত ‘মুখতাছার’-এর রচয়িতা। তাঁর মাধ্যমে আল্লাহ অসংখ্য মানুষকে (তালিবে ইলমকে) উপকৃত করেছেন। আমাদের একজন হানাফী মনীষী আবু নাসর আলইয়াযী সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, শাহাদত বরণের সময় তিনি এমন চল্লিশজন সঙ্গী রেখে গেছেন, যারা ইমাম আবু মানসুর মাতুরীদীর সমসাময়িক। তদ্রূপ ‘আসহাবুল আমালী’ যারা ইমাম আবু ইউসুফ রাহ. থেকে ‘আমালী’ বর্ণনা করেছেন তাঁদের সংখ্যাও অগণ্য। সমরকন্দ ও মা-ওয়ারাউন্নাহ্‌রে ফিকহে হানাফীর কত মাশায়েখ ছিলেন তা কি গণনা করা সম্ভব? একজন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি আমাকে বলেছেন যে, যাকরদীজাহ শহরে একটি কবরস্থান আছে যার নাম ‘তুরবাতুল মুহাম্মাদীন’। এখানে প্রায় চারশ’ মনীষী শায়িত আছেন, যাঁদের সকলের নাম মুহাম্মাদ এবং প্রত্যেকে ছিলেন ফকীহ ও মুসান্নিফ (গ্রন্থকার)। (বুখারার), কালাবায শহরে ‘মাকবারাতুস সুদূর’ কবরস্থানে অসংখ্য হানাফী ফকীহ শায়িত আছেন। তদ্রূপ বুখারার নিকটে ‘মাকবারাতুল কুযাতিস সাবআ’তে সমাহিত হয়েছেন অসংখ্য ফকীহ, যাদের অন্যতম হলেন ইমাম আবু যায়েদ আদ-দাবূসী। তদ্রূপ (পশ্চিম বাগদাদে) শূনীযে ‘মাকবারা আসহাবে আবী হানীফা’তে অসংখ্য হানাফী ফকীহ সমাহিত আছেন। তদ্রূপ কত বিখ্যাত পরিবার ছিল, যাতে অসংখ্য ফকীহ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। দামাগানী পরিবার ও সায়েদী পরিবারের গ্রহ-নক্ষত্রদের কে গণনা করে শেষ করতে পারে? ... কাযিল কুযাত আবু আবদুল্লাহ দামাগানীর ঘরানা থেকে তো অসংখ্য ফকীহ বিচারকের দায়িত্বও পালন করেছেন। আমাদের একজন ফকীহ মুহাম্মাদ ইবনে আবদিল মালিক হামাযানীর একটি বৃহৎ গ্রন্থ আমি দেখেছি, যাতে আবু আবদিল্লাহ দামাগানী ও ইমাম সায়মারীর শুধু ওইসব সঙ্গীর আলোচনা করা হয়েছে, যারা তাদের নিকট থেকে সরাসরি (ইলম ও ফিকহ) গ্রহণ করেছিলেন। তদ্রূপ ছাফফারিয়্যাহ পরিবার, নূহিয়্যা পরিবার ও লামগানী পরিবারেও অসংখ্য আলিম, যাহিদ, কাযী ও ফকীহ জন্মগ্রহণ করেছেন।-আলজাওয়াহিরুল মুযিয়্যা ১/৫-৯

পঞ্চম বৈশিষ্ট্য : মুসলিম জাহানে কুরআন-সুন্নাহর আইন হিসেবে গৃহীত : 


ফিকহে হানাফী ছিল তৎকালীন বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজশক্তিগুলোর রাষ্ট্রীয় আইন। বিভিন্ন সালতানাতের সময় কুফা ও বাগদাদ থেকে শুরু করে পূর্ব দিকে কাশগর ও ফারগানা পর্যন্ত, উত্তরে হালাব, মালাত্‌ইয়া ও এশিয়া মাইনর পর্যন্ত এবং পশ্চিমে মিসর ও কাইরাওয়ান পর্যন্ত ফিকহে হানাফী অনুসারে কাযা পরিচালিত হয়েছে। তাই মুসলিম জাহানের এই সুবিস্তৃত অঞ্চলে কুরআন-সুন্নাহর আইন বাস্তবায়ন এবং সুবিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ফিকহে হানাফীর অবদান অনস্বীকার্য। হিজরী দ্বিতীয় শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত কুরআন-সুন্নাহর জগদ্বিখ্যাত মনীষীদের প্রত্যক্ষ প্রচেষ্টায় যখন ফিকহে হানাফী সংকলিত হল তখন থেকেই মুসলিম জাহানের বিস্তৃত ভূখণ্ডে তা বিপুলভাবে সমাদৃত হয়। হাদীস ও ফিকহের ইমামগণের মাধ্যমে বিখ্যাত শহরগুলোতে ফিকহে হানাফীর বহু কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে কুফা নগরীতে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা., হযরত আলী ইবনে আবী তালিব রা. এবং অন্যান্য ফকীহ সাহাবীদের মাধ্যমে ফিকহে ইসলামীর যে বুনিয়াদ স্থাপিত হয়েছিল তা ইরাকের সীমানা অতিক্রম করে গোটা মুসলিম জাহানে ছড়িয়ে পড়ে। তখন প্রবল প্রতাপান্বিত আব্বাসী শাসনের পূর্ণ যৌবন। এ সময় ফিকহে হানাফীই রাষ্ট্রীয় আইন হিসেবে গৃহীত হল। খেলাফতে রাশেদার পর কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাষ্ট্র যদিও ‘খিলাফত আলা মিনহাজিন নুবুওয়াহ’ থেকে বিচ্যুত হয়েছিল, কিন্তু আইন ও বিচারের ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহর শাসন অক্ষুণ্ন ছিল। আর এর পিছনে মৌলিক অবদান ছিল কুরআন-সুন্নাহ থেকে আহরিত ফিকহে ইসলামীর। আব্বাসী শাসন ছাড়াও ছামানী, বনী-বুওয়াইহ, সালজুকী, গযনী ও আইয়ুবী শাসনামলেও এই ধারা অব্যাহত ছিল। রাজ্যশাসন মুসলিম শাসকদের দ্বারা পরিচালিত হলেও বিচার-বিভাগ ছিল ফিকহে ইসলামীর অধীন। তাই আঞ্চলিক প্রশাসকদের কথা তো বলাই বাহুল্য, সালতানাতের প্রধান ব্যক্তিকেও কখনো কখনো সাধারণ বাদীর সঙ্গে বিবাদীর কাঠগড়ায় দাড়াতে হয়েছে। এটি ইসলামী ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। আর যখন এর ব্যতিক্রম হয়েছে তখন মুসলিম বিচারপতিগণ তাদের দৃঢ়তা ও আসম সাহসিকতার দ্বারা যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন তা সমকালীন বিশ্বের উজ্জ্বলতম ইতিহাস। বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ এই প্রবন্ধে নেই। সচেতন ব্যক্তিদের তা অজানাও নয়। হিজরী দ্বিতীয় শতকের শেষার্ধে ইমাম আবু হানীফা রা.-এর বিখ্যাত সঙ্গীগণ কাযা ও বিচারের মসনদ অলংকৃত করেন। ইমাম আবু ইউসুফ রাহ. (১৮৩ হি.) ছিলেন গোটা মুসলিম জাহানের কাযিউল কুযাত। হারুনুর রশীদের সময় দারুল খিলাফা রাক্কা শহরে স্থানান্তরিত হলে ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান রাহ. (১৩১-১৮৯ হি.) সে শহরে কাযার দায়িত্ব পালন করেন। তদ্রূপ ইমাম যুফার ইবনুল হুযাইল (১৫৮ হি.) বছরায়, ইমাম কাসিম ইবনে মা’ন (১৭৫ হি.) কুফায়, ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে যাকারিয়া ইবনে আবী যাইদাহ (১৮৪ হি.) মাদায়েনে, ইমাম আবু মুহাম্মাদ নূহ ইবনে দাররাজ (১৮২ হি.) কুফায়, ইমাম হাফস ইবনে গিয়াছ (১১৭-১৯৪ হি.) কুফা ও বাগদাদে (কুফায় তেরো বছর, বাগদাদে দুই বছর) আফিয়া ইবনে ইয়াযীদ আওদী (১৮০), বাগদাদে কাযা পরিচালনা করেন। তদ্রূপ হুসাইন ইবনুল হাসান আওফী (২০১) পূর্ব বাগদাদে, আলী ইবনে যাবইয়ান আবসী (১৯২ হি.), ইউসুফ ইবনে ইমাম আবু ইউসুফ (১৯২ হি.) বাগদাদে, মুহাম্মাদ ইবনে মুকাতিল রাযী (২২৬ হি.) ও নাসর ইবনে বুজাইর যুহলী রায় শহরে কাযার দায়িত্বে ছিলেন। ইমাম ইসমাইল ইবনে হাম্মাদ ইবনে আবু হানীফা (২১২ হি.) ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে সামাআ (১৩০ হি.-২৩৩ হি.) ইমাম ঈসা ইবনে আবান ইবনে সাদাকা (২২১ হি.), আবদুর রহমান ইবনে ইসহাক (২২৮ হি.), বিশর ইবনুল ওয়ালীদ কিনদী (২৩৮ হি.), হাইয়ান ইবনে বিশর (২৩৮ হি.), হাসান ইবনে উছমান যিয়াদী (২৪৩ হি.), উমার ইবনে হাবীব (২৬০ হি.) ইবরাহীম ইবনে ইসহাক (২৭৭ হি.), বুহলূল ইবনে ইসহাক (২৯৮ হি.), আহমদ ইবনে মুহাম্মাদ আলবিরতী (২৮০ হি.) কাযী আবু খাযিম আবদুল হামীদ ইবনে আবদুল আযীয (২৯২ হি.), কাযী আহমদ ইবনে ইসহাক ইবনে বুহলূল (২৩১-৩১০ হি.), আহমদ ইবনে মুহাম্মাদ নাইছাবুরী (৩৫১ হি.), আহমদ ইবনে মুহাম্মাদ, আবু বকর দামাগানী, তহাবী ও কারখীর শীষ্য, হুসাইন ইবনে আলী সাইমারী (৩৫১-৪৩৬ হি.) প্রমুখ ফিকহ ও হাদীসের বিখ্যাত ইমাম ও তাঁদের শীষ্যদের উপর কাযার দায়িত্ব অর্পিত ছিল। বাগদাদ, কুফা, বছরা, আম্বার, হীত, মাওসিল, ওয়াসিত, মাম্বিজ, রায় প্রভৃতি বিখ্যাত শহরে তাঁরা ফিকহে হানাফী অনুসারে কাযা পরিচালনা করেছেন। মুসলিম জাহানের এই কেন্দ্রীয় শহরগুলিতে এত অধিক সংখ্যক ফকীহ ও কাযী বিদ্যমান ছিলেন, যা অনুমান করাও কঠিন। ইমাম সায়েদ ইবনে মুহাম্মাদ ‘কিতাবুল ইতিকাদ’ গ্রন্থে আবদুল মালিক ইবনে আবিশ শাওয়ারিব থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বসরার প্রাচীন ভবনের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, ‘এই গৃহ থেকে সত্তরজন বিচারক বের হয়েছেন, যারা প্রত্যেকে ফিকহে হানাফী অনুসারে ফয়সালা করতেন ...।’-আলজাওয়াহিরুল মুযিয়্যাহ ২/২৬৭ ইরাক যেহেতু ফিকহে হানাফীর মাতৃভূমি তাই এ সম্পর্কে অধিক আলোচনা বাহুল্য মনে হতে পারে। তাই ইরাক ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহের আলোচনা এখানেই সমাপ্ত করে অন্যান্য ভূখণ্ডের আলোচনায় প্রবেশ করছি।

খোরাসান ও মা-ওয়ারাউন্নাহরে আগেই বলা হয়েছে যে, হিজরী দ্বিতীয় শতকেই ফিকহে হানাফী মুসলিম জাহানের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। এ প্রসঙ্গে হাদীস ও ফিকহের বিখ্যাত ইমাম, সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ (১০৭-১৯৮ হি.)-এর একটি উক্তি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন, ‘‘আমার ধারণা ছিল যে, ইরাকের দুটি বিষয় : আবু হানীফার ফিকহ ও হামযার কিরাআত কূফার পুল অতিক্রম করবে না, অথচ তা পৃথিবীর প্রান্তসমূহে পৌঁছে গিয়েছে।’-তারীখে বাগদাদ ১৩/৩৪৮ তাঁর এই বক্তব্যের বাস্তবতা এভাবে বোঝা যায় যে, হিজরী দ্বিতীয় শতক সমাপ্ত হওয়ার আগেই খোরাসান ও মা-ওয়ারাউন্নাহ্‌র অঞ্চলেও ফিকহে হানাফী অনুযায়ী কাযা ও বিচার পরিচালিত হতে থাকে। ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর শীষ্যদের মধ্যে হাফস ইবনে আবদুর রহমান নাইছাবুরী (১৯৯ হি.), নাইছাবুরে, নূহ ইবনে আবী মারইয়াম মারওয়াযী (১৭৩ হি.) মার্ভে, ইমাম উমার ইবনে মায়মূন বলখী (১৭১ হি.) বলখে (২০ বছরেরও অধিক) ও ইমাম আবু মুতী হাকাম ইবনে আবদুল্লাহ বলখী (১৯৭ হি., ৮৪ বছর বয়সে) বলখে (১৬ বছর) কাযার দায়িত্ব পালন করেন। বলখের শাসকের সঙ্গে তাঁর একটি চমৎকার ঘটনা ইতিহাসের পাতায় সংরক্ষিত আছে। (দেখুন : আলজাওয়াহিরুল মুযিয়্যাহ ৪/৮৭ কুনা অংশ) খোরাসান ও মাওয়ারাউন্নাহর হচ্ছে মুসলিম জাহানের এমন এক ভূখণ্ড,যা ইরাক ও হারামাইনের মতো হাদীস ও ফিকহের অন্যতম কেন্দ্র ছিল। বহু বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকীহ এখানে জন্মগ্রহণ করেছেন। তদ্রূপ বিভিন্ন সময় তা ছিল মুসলিম শাসকদের রাজনৈতিক কর্মতৎপরতারও প্রধান কেন্দ্র। আল্লামা তাজুদ্দীন আবদুল ওয়াহহাব ইবনে আলী আস-সুবকী রাহ. (৭২৭-৭৭১ হি.) লেখেন, ‘খোরাসানের কেন্দ্রীয় শহর চারটি : মার্ভ, নিশাপুর, বলখ ও হারাত। এগুলি খোরাসানের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ শহর। এমনকি গোটা মুসলিম জাহানের কেন্দ্রীর শহর বললেও অত্যুক্তি হবে না। কেননা, এগুলো ছিল উলূম ও ফুনূনের মারকায এবং বিখ্যাত মুসলিম শাসকদের রাষ্ট্রীয় কর্মতৎপরতার কেন্দ্র।’’-তবাকাতুশ শাফেইয়্যাতিল কুবরা ১/৩২৫ বিখ্যাত আব্বাসী খলীফা মামূনুর রশীদ দীর্ঘদিন মার্ভে ছিলেন। সে সময়ের একটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইতিহাসের গ্রন্থে তা বিস্তারিতভাবে আছে। সংক্ষেপে ঘটনাটি এই যে, খোরাসান অঞ্চলে ফিকহে হানাফীর ব্যাপক বিস্তার লক্ষ করে কিছু মানুষ ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েন এবং ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর গ্রন্থসমূহ জলাশয়ের পানিতে ধুয়ে ফেলতে আরম্ভ করেন। বিষয়টি খলীফার দরবার পর্যন্ত পৌঁছে গেল। তিনি তাদের তলব করে এ কাজের ব্যাখ্যা জানতে চাইলেন। তারা বললেন, এই ফিকহ হাদীসবিরোধী! মামুন নিজেও ছিলেন হাদীস ও ফিকহের প্রাজ্ঞ পণ্ডিত। যখন সুনির্দিষ্টভাবে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা শুরু হল তখন মামুন নিজেই তাদের সকল অভিযোগ খণ্ডন করে ফিকহে হানাফীর ওই সিদ্ধান্তগুলো হাদীস দ্বারা প্রমাণ করে দিলেন। তারা লা-জবাব হয়ে গেলে মামুন তাদের সাবধান করে দিলেন এবং বললেন, ‘এই ফিকহ যদি প্রকৃতপক্ষেই কুরআন-সুন্নাহর বিরোধী হত তবে আমরা কখনো তা রাষ্ট্রীয় আইন হিসেবে গ্রহণ করতাম না।’ (মানাকিবুল ইমাম আযম, সদরুল আইম্মা; ইমাম ইবনে মাজাহ আওর ইলমে হাদীস (টীকা) পৃ. ১০) হিজরী তৃতীয় শতকে ফিকহে হানাফীর যেসব মনীষী এ অঞ্চলে কাযা পরিচালনা করেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন এই - নসর ইবনে যিয়াদ, আবু মুহাম্মাদ (২৩৩ হি.) ইমাম মুহাম্মাদ রাহ.-এর শীষ্য; নাইছাবুর দশ বছরেরও অধিক। হাইয়ান ইবনে বিশর (২৩৮ হি.), ইমাম আবু ইউসুফ রাহ.-এর শীষ্য; আসবাহান, পরে পূর্ব বাগদাদ। হাসসান ইবনে বিশর নাইছাবুরী (২৪৪ হি.), ইমাম হাসান ইবনে যিয়াদের শীষ্য; নাইছাবুর। সাহল ইবনে আম্মার নাইছাবুরী (২৬৭ হি.), প্রথমে তূছ পরে হারাত। মুহাম্মাদ ইবনে আহমদ ইবনে মূসা বুখারী (২৮৯ হি.) বুখারা। মুহাম্মাদ ইবনে আসলাম আযদী (২৬৮ হি.) সমরকন্দ। ইবরাহীম ইবনে মা’কিল নাসাফী (২৯৫ হি.) নাসাফ। হাফিযুল হাদীস হিসেবেও বিখ্যাত ছিলেন। হাফেয যাহাবী রাহ. (৬৭৩-৭৪৮ হি.) ‘তাযকিরাতুল হুফফায’ গ্রন্থে শানদার ভাষায় তাঁর আলোচনা করেছেন। ইমাম বুখারী রাহ. (১৯৪-২৫৬ হি.) থেকে তাঁর যে চারজন শীষ্য সহীহ বুখারী রেওয়ায়েত করেছেন তিনি তাদের অন্যতম। আবদুল্লাহ ইবনে সালামা, ইবনে সালমূয়াহ (২৯৮ হি.) নাইছাবুর। বিখ্যাত মুহাদ্দিস মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক ইবনে খুযাইমা রাহ. (৩১১ হি.) মাযহাবের ভিন্নতা সত্ত্বেও তাঁর বিশ্বস-তা ও জ্ঞান-গরিমার কারণে কাযার জন্য তাঁর নামই প্রস্তাব করেন। চতুর্থ হিজরী শতকের মনীষীদের মধ্যে আহমদ ইবনে সাহল (৩৪০ হি.) ও ইসহাক ইবনে মুহাম্মাদ, আবুল কাসিম (৩৪২ হি.) সমরকন্দ, তাহির ইবনে মুহাম্মাদ বাকরাবাযী (৩৬৯ হি.) মার্ভ, হারাত, সমরকন্দ, শাশ, বলখ ও ফারগানায়, আতা ইবনে আহমদ আরবিনজানী (৩৬৯ হি.) সমরকন্দের আরবিনজান শহরে, আবদুর রহমান ইবনে মুহাম্মাদ ফুযযী (৩৭৪ হি.) তিরমিয শহরে, কাযিল কুযাত আহমদ ইবনুল হুসাইন মারওয়াযী (৩৭৭ হি.) খোরাসানে, উবায়দুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ আননাযরী (৩৮৮ হি.) নাসাফে, উতবা ইবনে খাইছামা নাইছাবুরী (৪০৬ হি.) খোরাসানে (৩৯২-৪০৫ পর্যন্ত) কাযা পরিচালনা করেন। শেষোক্তজন ছিলেন খোরাসানের বিখ্যাত ফকীহ। সমকালে ফিকহ, ফতোয়া ও অধ্যাপনায় তাঁর সমকক্ষ কেউ ছিল না। হাকিম আবু আবদুল্লাহ নাইছাবুরী বলেন, ‘... তিনি নিজ যুগে অপ্রতিদ্বন্দী ছিলেন। খোরাসানে হানাফী মাযহাবের কোনো কাযী এমন ছিলেন না যিনি কোনো না কোনো সূত্রে তাঁর শীষ্য নন।’ (আলজাওয়াহিরুল মুযিয়্যা ২/৫১১) এছাড়া কিছু পরিবার এমন ছিল, যাতে শত শত বছর পর্যন্ত বহু ফকীহ ও কাযী জন্মগ্রহণ করেছেন। ইমাম সায়েদ ইবনে মুহাম্মাদ (৪৩২ হি.)-এর আলোচনায় হাফেয সামআনী রাহ. (৬১৫ হি.) বলেন, আজ পর্যন্ত নিশাপুরের কাযা ও বিচার সায়েদী পরিবারেই রয়েছে। একই কথা আবদুল কাদের কুরাশী (৭৭৫ হি.)ও বলেছেন।-আলজাওয়াহিরুল মুযিয়্যা ২/২৬৫ কাযিল কুযাত ইমাম আবু মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ইবনুল হুসাইন নাসিহী (৪৪৭ হি.) সুলতান মাহমুদ ইবনে সবক্তগীনের সময় বুখারার বিচারপতি ছিলেন। পরবর্তীতে নাসিহী পরিবারে বহু আলিম, ফাযিল, কাযী ও ফকীহ জন্মগ্রহণ করেছেন। দেখুন : আলজাওয়াহিরুল মুযিয়্যা ১/২৮১, ১/৪০৯ মোটকথা, খোরাসান ও মা-ওয়ারাউন্নাহরে এত অসংখ্য ফকীহ ও মুহাদ্দিস ছিলেন এবং এত উঁচু পর্যায়ের মনীষীগণ কাযা ও বিচারের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন, যা আজ অনুমান করাও সহজ নয়। উল্লেখ্য, খোরাসান, মা-ওয়ারাউন্নাহর ও বর্তমান ইরানের বিস্তৃত অঞ্চল আব্বাসী শাসন ছাড়াও বিভিন্ন সময় ছামানী, (২৬১-৩৯৫), বনী বুওয়াইহ (৩২০-৪৪৭ হি.), গযনভী (৩৬৬-৫৮২ হি.), সালজূকী (৪২৯-৫৫২ হি.) ইত্যাদি শক্তিশালী সালতানাতের অধীন ছিল। তাই বাগদাদের মতো এ অঞ্চলও দীর্ঘ সময় পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় কর্মতৎপরতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। সভ্যতা, জ্ঞানচর্চা ও জীবনযাত্রার মানের বিচারে এই ভূখণ্ড বাগদাদ ও ইরাকের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না। ঐতিহাসিক মাকদিসী লেখেন, ‘‘খোরাসান ও মা-ওয়ারাউন্নাহর গোটা সাম্রাজ্যের মধ্যে সর্বাধিক উন্নত। এটি একটি সমৃদ্ধ জনপদ। প্রচুর কৃষিজমি, জলাশয় ও ফলমুলের বাগান দ্বারা পরিবেষ্টিত এবং মূল্যবান খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। নাগরিকরা অত্যন্ত সৎ, দানশীল ও অতিথিপরায়ণ। শহরগুলোতে সুশাসন ও নিরাপত্তা রয়েছে। গোটা ভূখণ্ডে অনেক মাদরাসা। আলিমদের সংখ্যা অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি। ফকীহগণ বাদশাহর মতো প্রতাপ ও মর্যাদার অধিকারী। বিদআতী কর্মকাণ্ড নেই। মানুষ সীরাতে মুসতাকীমের উপর রয়েছে। মুসলমানগণ বাস্তবিকই এই ভূখণ্ডের উপর গর্ববোধ করতে পারেন।’-আহসানুত তাকাসীম ফী মা’রিফাতিল আকালীম পৃ. ২৬০; মিল্লাতে ইসলামিয়া কী মুখতাসার তারীখ ১/২৪৭ তদ্রূপ সমরকন্দ, নিশাপুর, রায় প্রভৃতি শহরের যে বিবরণ তিনি দিয়েছেন তাতে প্রতীয়মান হয় যে, বর্তমান ইউরোপ-আমেরিকার শ্রেষ্ঠ শহরগুলোর চেয়েও মুসলিম জাহানের এই ভূখণ্ডগুলো শান্তিশৃঙ্খলা এবং সভ্যতা ও সুশাসনে অগ্রগামী ছিল। (প্রাগুক্ত) হিজরী সপ্তম শতকে তাতারীদের বর্বর আক্রমণে গোটা মুসলিম জাহান ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যাওয়ার পর সেই সমৃদ্ধি আর ফিরে আসেনি। শুধু তাই নয় এর পরের ইতিহাস তো শুধু অশ্রু ও রক্তের ইতিহাস।
দামেশক, হলব ও মালাত্‌ইয়ায়
ইমাম আবু হানীফা রাহ. এর সময়ে শামের ফকীহ ছিলেন ইমাম আবু আম্‌র আবদুর রহমান ইবনে আম্‌র আওযায়ী (১৫৭ হি.)। তিনি ফিকহে হানাফী সম্পর্কে অবগত ছিলেন। প্রথমদিকে অস্পষ্টতা থাকলেও ইমাম আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহ.-এর মাধ্যমে তাঁর ভুল ধারণার অবসান ঘটেছিল। ফিকহে হানাফীর সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরিচয়ের পর তিনি তাঁর মুগ্ধতা প্রকাশ করেছিলেন। পরবর্তীতে যখন ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাত হল এবং উভয়ে বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় করলেন তখন এই মুগ্ধতা বিস্ময় ও ঈর্ষায় পরিণত হয়েছিল। (দেখুন : মানাকিবুল ইমাম আবী হানীফা, কারদারী, আছারুল হাদীসিশ শরীফ পৃ. ১১২) হিজরী তৃতীয় শতক ও তার পর দামেশক, হলব, হামাত ও শামের অন্যান্য শহরে, এমনকি সুদূর মালাত্‌ইয়াতেও ফিকহে হানাফীর কাযী বিদ্যমান ছিলেন। তাঁদের মধ্যে আবু খাযিম আবদুল হামীদ ইবনে আবদুল আযীয (২৯২ হি.), ইমাম তহাবী ও ইমাম আবু তাহির আদদাববাসের শায়খ; আবু জা’ফর আহমদ ইবনে ইসহাক, আবুল হাসান আহমদ ইবনে ইয়াহইয়া উকাইলী, আবুল হাসান আহমদ ইবনে হিবাতুল্লাহ, (৬১৩ হি.) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শামের দামেশক, হলব প্রভৃতি বিখ্যাত শহরে তাঁরা কাযার দায়িত্বে ছিলেন। এ ছাড়া আবদুল্লাহ ইবনে ইবরাহীম ও আহমদ ইবনে আবদুল মজীদ মালাত্‌ইয়ার কাযী ছিলেন। কাযী আবদুল্লাহ ইবনে ইবরাহীম রাহ.-এর পিতা ইবরাহীম ইবনে ইউসুফ মাকিয়ানী (২৪১ হি.) ফিকহে হানাফীর বিখ্যাত ইমাম ছিলেন। (দেখুন : আলজাওয়াহিরুল মুযিয়্যা ১/১১৯) তদ্রূপ আহমদ ইবনে আবদুল মজীদের পিতা আবদুল মজীদ ইবনে ইসমাইল হারাভী (৫৩৭ হি.) বিলাদুর রোমের কাযী ছিলেন। হিজরী সপ্তম শতকে দামেশকের শাসক ছিলেন ঈসা ইবনে আবু বকর ইবনে আইয়ুব (৫৬৭-৬২৪ হি.)। আট বছরেরও অধিক কাল তিনি দামেশকের শাসক ছিলেন। তিনি ও তাঁর বংশধরগণ ছিলেন ফিকহে হানাফীর অনুসারী। এ শতকে ফিকহে হানাফী অনুসারে কাযা পরিচালনাকারী কয়েকজনের নাম এই : ইসমাইল ইবনে ইবরাহীম শাইবানী (৬২৯ হি.) দামেশক; খলীল ইবনে আলী হামাভী (৬৪১ হি.) দামেশক; আবুল কাসিম উমার ইবনে আহমদ (৫৮৮-৬৬০ হি.) হলব; আবদুল কাদের (৬২৩-৬৯৬ হি.) হলব; ইবরাহীম ইবনে আহমদ (৬৯৭ হি.) হলব; মাজদুদ্দীন আবদুর রহীম ইবনে উমার ইবনে আহমদ (৬৭৭ হি.) শাম; কাযিল কুযাত সুলায়মান ইবনে উহাইব, ইবনু আবিল ইয (৬৭৭ হি.) মিসর ও শাম, কাযিল কুযাত ইমাম আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ আযরায়ী (৫৯৫-৬৭৩ হি.) দামেশক; কাযিল কুযাত ইমাম আবদুল আযীয ইবনে মুহাম্মাদ, হামাত; কাযিল কুযাত হাসান ইবনে আহমদ (৬৩১ হি.-৬৯৯ হি. আনু.) মালাত্‌ইয়াতে বিশ বছরের অধিক, অতঃপর দামেশকেও বিশ বছরের অধিক, সবশেষে মিসরে। ৬৯৯ হিজরীতে তাতারীদের আক্রমণের সময় নিখোঁজ হন। এঁদের পর কাযিল কুযাত আলী ইবনে মুহাম্মাদ, সদরুদ্দীন (৬৪২-৭২৭) দামেশক; কাযিল কুযাত আহমদ ইবনুল হাসান (৬৫১-৭৪৫ হি.) দামেশক; তাঁর পিতা ও দাদাও কাযিল কুযাত ছিলেন। কাযিল কুযাত আহমদ ইবনে আলী (৭১১ হি.) দামেশক; উমার ইবনে আবদুল আযীয, ইবনে আবী জারাদা (৬৭৩ হি.-৭২০ হি.) হলব, তার মৃত্যুর পর তার পুত্র নাসিরুদ্দীন মুহাম্মাদ কাযিল কুযাত হন; কাযিল কুযাত আলী ইবনে আহমদ তরাসূসী (৬৬৯-৭৪৮ হি.) দামেশক; প্রমুখ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এদের পরিচয় ও অবদান সম্পর্কে জানার জন্য আল-জাওয়াহিরুল মুযিয়্যাহ, আল-ফাওয়াইদুল বাহিয়্যা ও অন্যান্য জীবনী-গ্রন্থ অধ্যয়ন করা যেতে পারে।
পশ্চিমে মিসর ও কাইরাওয়ানে
লোহিত সাগরের পশ্চিমে মিসরেও ফিকহে হানাফী হিজরী দ্বিতীয় শতকেই প্রবেশ করেছিল। এ অঞ্চলে ফিকহে হানাফীর প্রথম কাযী ছিলেন আবুল ফযল ইসমাইল ইবনুন নাসাফী আলকুফী। তিনি মাহদীর সময় ১৬৪ হি. থেকে ১৬৭ হি. পর্যন্ত কাযার দায়িত্বে ছিলেন। মিসরের বিখ্যাত মুজতাহিদ লাইছ ইবনে সা’দ রাহ. ফিকহী মতভেদ সত্ত্বেও তাঁর যোগ্যতা ও বিশ্বস্ততার উচ্চ প্রশংসা করেছেন। (দেখুন : আলজাওয়াহিরুল মুযিয়্যাহ ১/৪৩৮-৪৩৯) এছাড়া মুহাম্মাদ ইবনে মাসরূক আল কিনদী ১৭৭ হি. থেকে ১৮৫ হি. পর্যন্ত, হাশিম ইবনে আবু বকর আলবাকরী (১৯৬ হি.) ১৯৪ হি. থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মিসরে কাযার দায়িত্বে ছিলেন। দ্বিতীয় হিজরী শতকের শুরুতে কাযী ইবরাহীম ইবনুল জাররাহ (২১৭ হি.) ২০৫ থেকে ২১১ হি. পর্যন্ত কাযা পরিচালনা করেন। তবে এ শতাব্দীতে যিনি দীর্ঘ সময় মিসরের কাযার দায়িত্বে ছিলেন এবং গোটা মিসরে যাঁর প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা ছিল অতুলনীয় তিনি হলেন ইমাম বাক্কার ইবনে কুতাইবা রাহ. (২৭০ হি.)। ২৪৬ হিজরীতে কাযার দায়িত্ব নিয়ে মিসরে এসেছিলেন এবং মৃত্যু পর্যন্ত ২৩ বছরেও অধিককাল গোটা মিসরের অপ্রতিদ্বন্দী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর সমসাময়িক আরেকজন হানাফী মনীষী হলেন ইমাম আবু জা’ফর আহমদ ইবনে আবী ইমরান (২৮০ হি.) ২০ বছরেরও অধিক কাল তিনি মিসরে অবস্থান করেছেন। হিজরী তৃতীয় শতকের বিখ্যাত মুজতাহিদ আবু জা’ফর তহাবী (মৃ. ৩২১ হি.) উপরোক্ত দু’জনেরই সাহচর্য পেয়েছিলেন। তদ্রূপ মুহাম্মাদ ইবনে আবদা ইবনে হারব, আবু আবদিল্লাহ বসরী (৩১৩ হি.) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অত্যন্ত দানশীল ছিলেন। ছয় বছর সাত মাস প্রতাপের সঙ্গে কাযা পরিচালনা করেছেন। তাঁর দুটি মজলিস হত : হাদীসের মজলিসে মুহাদ্দিসগণ ও ফিকহের মজলিসে ফকীহগণ শরীক হতেন। এছাড়া ইসহাক ইবনে ইবরাহীম শাশী (৩২৫ হি.), মুহাম্মাদ ইবনে বদর ইবনে আবদুল আযীয, আবু বকর মিসরী (২৬৪-৩৩০ হি.) (ইমাম তহাবীর শীষ্য) ও ইমাম আবুল আব্বাস ইবনু আবিল আওয়াম (৪১৮ হি.) প্রমুখ মিসরে কাযা পরিচালনা করেছেন। ইমাম ইবনু আবিল আওয়াম রাহ. ১২ বছর ছয় মাস ২৫ দিন কাযার দায়িত্বে ছিলেন। (দেখুন : আলউলাতু ওয়াল কুযাত, টীকা হুসনুল মুহাযারা ২/১৪৮) হিজরী সপ্তম শতকের মাঝামাঝিতে আল মালিকুয যাহির বাইবার্‌ছ (৬২৫-৬৭৬ হি.) প্রথমে কাহেরা (কায়রো) পরে দামেশকে প্রত্যেক মাযহাবের আলাদা কাযী নিয়োগের নিয়ম জারি করেন। ওই সময় থেকে দশম শতকের প্রায় শেষ পর্যন্ত যারা ফিকহে হানাফী অনুযায়ী কাযা পরিচালনা করেছেন তাদের একটি তালিকা হাফেয জালালুদ্দীন সুয়ূতী রাহ. (৯১১ হি.) উল্লেখ করেছেন। এঁদের মধ্যে বিখ্যাত কয়েকজন হলেন, সদরুদ্দীন সুলায়মান, ইবনু আবিল ইযয (৬৭৭ হি.), মুয়িযযুদ্দীন আন-নু’মান ইবনুল হাসান (৬৯২ হি.), হুসামুদ্দীন আলহাসান ইবনে রাযী (৬৯৯ হি. আনু.), শামছুদ্দীন আহমদ ইবনে ইবরাহীম আস-সারুজী (৭০১ হি.) শামছুদ্দীন মুহাম্মাদ ইবনে উছমান (৭২৮ হি.), ইমাম বুরহানুদ্দীন আলী ইবনে আহমদ (৭৪৪ হি.), আলাউদ্দীন আলী ইবনে উছমান (৭৪৫ হি.) এরপর তাঁর পুত্র জামালুদ্দীন আবদুল্লাহ ইবনে আলী ইবনে উছমান (৭৬৯ হি.), কাযিল কুযাত আসসিরাজুল হিন্দী উমর ইবনে ইসহাক গযনবী (৭৭৩ হি.), জামালুদ্দীন মাহমুদ ইবনে আলী আলকায়সারী (৭৯৯ হি.), কাযিল কুযাত শামসুদ্দীন মুহাম্মাদ ইবনে আহমদ তরাবলুসী (৭৯৯ হি.), কাযিল কুযাত শামসুদ্দীন মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ মাকদিসী (৮২৭ হি.), কাযিল কুযাত যাইনুদ্দীন আবদুর রহীম ইবনে আলী আততাফাহ্‌নী (৮৩৫ হি.), কাযিল কুযাত বদরুদ্দীন মাহমুদ ইবনে আহমদ আলআইনী (৮৫৫ হি.) সহীহ বুখারীর ভাষ্যকার; কাযিল কুযাত সা’দুদ্দীন ইবনে কাযিল কুযাত শামসুদ্দীন (৮৬৭ হি.) প্রমুখ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। (দেখুন : হুসনুল মুহাযারা ২/১৮৪-১৮৭) তাঁর আরেকটি তালিকার শিরোনাম হল, ‘ফিকহে হানাফীর যে মনীষীগণ মিসরে ছিলেন’। এই তালিকার অধিকাংশ নাম পূর্বের তালিকাতেও এসেছে, কিছু নাম আছে, যা ওই তালিকায় নেই। তাঁদের মধ্যে বিশিষ্ট কয়েকজন হলেন-ইমাম জামালুদ্দীন আবু আব্দিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে সুলায়মান বলখী (৬৯৮ হি.), আবুল হাসান আলী ইবনে বালবান (৭৩১ হি.) সহীহ ইবনে হিব্বান বিষয়ভিত্তিক বিন্যাসে তিনিই বিন্যস- করেছেন; ফখরুদ্দীন উছমান ইবনে ইবরাহীম মারদীনী, ইবনুত তুরকুমানী (৭৩১ হি.) ইনি আল জাওহারুন নাকী রচয়িতা আলাউদ্দীন ইবনুত তুরকুমানীর পিতা; কানযুদ দাকাইক গ্রন্থের ভাষ্যকার ফখরুদ্দীন উছমান ইবনে আলী আযযায়লায়ী (৭৪৩ হি.); আমীর কাতিব আলইতকানী (৭৫৮ হি.); আলজাওয়াহিরুল মুযিয়্যাহ-গ্রন্থকার আবু মুহাম্মাদ আবদুল কাদির ইবনে মুহাম্মাদ আলকুরাশী (৭৭৫ হি.); আকমালুদ্দীন মুহাম্মাদ ইবনে মুহাম্মাদ আলবাবরতী (৭৮৬ হি.), সিরাজুদ্দীন উমর ইবনে আলী কারিউল হিদায়া (৮২৯ হি.); ফাতহুল কাদীর রচয়িতা ইমাম ইবনুল হুমাম কামালুদ্দীন মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল ওয়াহিদ (৮৬১ হি.); আবুল আব্বাস আহমদ ইবনে মুহাম্মাদ আশশুমুননী (৮৭২ হি.), সাইফুদ্দীন মুহাম্মাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে উমর ইবনে কুতলূবুগা (৮৮১ হি.) প্রমুখ। এই তালিকায় সুয়ূতী রাহ. তাঁর উস্তাদ ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে কুতলূবুগা (৮৮১ হি.) পর্যন্ত ৫৮ জন বিখ্যাত ফকীহর নাম উল্লেখ করেছেন। (দেখুন : হুসনুল মুহাযারা ১/৪৬৩-৪৭৮) আফ্রিকার কাইরাওয়ানে কাযা পরিচালনা করেছেন মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবদুন আর-রূআইনী (২৯৯ হি.)। বিভিন্ন তথ্য থেকে বোঝা যায় যে, প্রায় ত্রিশ বছর যাবত তিনি কাইরাওয়ানে অবস্থান করেছেন। তিনি ফিকহে হানাফীর উপর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থও রচনা করেছিলেন। (দেখুন : আলজাওয়াহিরুল মুযিয়্যা ৩/১৮৯) তারও আগে কাইরাওয়ানের কাযী ছিলেন ইমাম আসাদ ইবনুল ফুরাত (২১৩ হি.) তিনি যেমন ফিকহে মালেকীর ইমাম তেমনি ফিকহে হানাফীরও ইমাম ছিলেন। ঐতিহাসিক ইবনে খিল্লিকান বলেছেন, আফ্রিকায় ইমাম আবু হানীফার মাযহাবই ছিল সর্বাধিক প্রচারিত ও অনুসৃত। হিজরী পঞ্চম শতকে মুয়ীয ইবনে বাদীছ (৩৫৮-৪৫৪ হি.) এর হাতে কর্তৃত্ব আসার পর তিনি এ অঞ্চলের অধিবাসীদের ফিকহে মালেকী অনুসরণে বাধ্য করেন।-আলজাওয়াহিরুল মুযিয়্যা ১/৯
মোটকথা, মাশরিক থেকে মাগরিব পর্যন্ত মুসলিম জাহানের বিখ্যাত শহরগুলোতে ফিকহে হানাফীর দ্বারা কুরআন-সুন্নাহর আইন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আর তখন মুসলিম সাম্রাজ্য ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্য এবং মুসলিম উম্মাহ ছিল পৃথিবীর সেরা শক্তি। মুসলিম উম্মাহর রাজনৈতিক উত্থান ও প্রতিষ্ঠার দ্বিতীয় পর্বে সালতানাতে উছমানিয়া ও বৃটিশের অনুপ্রবেশের আগ পর্যন্ত ভারত উপমহাদেশেও ফিকহে হানাফী অনুসারে কাযা ও বিচার পরিচালিত হয়েছে। বলাবাহুল্য যে, এই পর্বের ইতিহাসও ফিকহে ইসলামীর যেকোনো পাঠককে উদ্দীপ্ত করবে।
আজ মুসলিম সমাজের যে শ্রেণী রোমান ল’ ও বৃটিশ আইনের প্রতি অতিমুগ্ধতায় আচ্ছন্ন এই ইতিহাস তাদের চরম দৈন্যকে প্রকাশ করে। তদ্রূপ যারা আল্লাহর যমীনে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী তাদের জন্যও এই ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।

পুনশ্চ : এই লেখাটি যখন আরম্ভ করি তখন শিরোনাম ছিল, ‘ইমাম আবু হানীফা ও ফিকহে হানাফী : কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য।’ কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর যখন প্রথম অংশটি দীর্ঘ হতে আরম্ভ করল তখন তা রেখে দিয়েছি। আবার নতুন করে অনুভব করেছি যে, ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর জীবনের যে কোনো একটি দিক তুলে ধরতে হলেও স্বতন্ত্র প্রবন্ধ; বরং গ্রন্থ রচনার প্রয়োজন। বর্তমান আলোচনা থেকেও তাঁর প্রজ্ঞা ও ব্যক্তিত্ব এবং কুরআন-সুন্নাহ্‌য় তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য অনুমান করা সম্ভব। মুসলিম জাহানের চরম উন্নতির যুগে ফিকহে হানাফীর বিপুল গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করে যে, তা পরিপূর্ণভাবে কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক এবং এর সংকলকগণ ছিলেন কুরআন-সুন্নাহর মুজতাহিদ ইমাম। তবে কেউ যদি গোটা বিশ্বের সকল মানুষকেই নির্বোধ মনে করেন তাহলে তার সঙ্গে আর আলোচনার সুযোগ থাকে না। আমরা তার জন্য শুধু দুআ করতে পারি, আল্লাহ যেন তাকে হেদায়েত দান করেন।

মাত্র ২০ টাকা খরচ করে পুরো ১ বছর মশার উপদ্রব থেকে মুক্ত থাকতে পারবেন।

সারা বছর মশার প্রচন্ড উপদ্রব-এ আমরা প্রচুর বিরক্ত। মশা থেকে মুক্ত থাকার জন্য আপনার মনে হয়তোবা কয়েলের ছবি ভাসছে। কিন্তু একবারও ভেবে দেখেছেন, এক বছরে আপনি কয়েলের পিছনে কত টাকা খরচ করেছেন? আর সব থেকে বড় কথা হলো, কয়েল মানব শরীরের জন্য কতটা ক্ষতিকর সেটা কি আপনি জানেন? এ্যারোসল যদি ব্যবহার করার চিন্তা থাকে তবে সেক্ষেত্রে সেটা মানব শরীরের জন্য আরো ভয়াবহ ক্ষতিকর। অথবা ইলেকট্রিক ব্যাট আছে কিন্তু মশার সাথে কতদিন ব্যাডমিন্টন খেলবেন? ১০টা মারবেন ১০০ মশা সামনে এসে হাজির হবে। আপনি মরে যাবেন কিন্তু আপনার মশা মারা আর শেষ হবে না! 

মশা মারার কয়েলের ক্ষতিকর দিকঃ 
১। আপনি যদি একটি মশার কয়েল টানা ৮ ঘন্টা জ্বালিয়ে রাখেন তাহলে ১৩৭টি সিগারেটের পরিমান বিষাক্ত ধোঁয়া আপনি গিলছেন। 
২। কয়েলে যে গুঁড়া দেখেন সেটা এতটাই সূক্ষ্ম যে তা সহজেই আমাদের শ্বাসনালীর এবং ফুসফুসের পথে গিয়ে জমা হয়ে বিষাক্ততা তৈরি করে। 
৩। কয়েলের ধোঁয়া চোখের ভীষন ক্ষতি করে, দীর্ঘদিন ব্যবহারে চোখের ভয়াবহ ক্ষতিসাধন হতে পারে।
৪। কয়েল মশাকে তাৎক্ষনিক মারে কিন্তু মানব দেহে স্লো পয়জনিং করে, ধীরে ধীরে মানুষ মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়। 

এ্যারোসলের ক্ষতিকর দিকঃ
১। এ্যারোসল হার্টের জন্য খুবই ক্ষতিকর। মানব দেহের হার্ট সরাসরি এ্যারোসলের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ হয়। 
২। এ্যারোসলের ক্যামিকেল চোখের ক্ষতি করে, দীর্ঘদিনের ব্যবহারে চোখের কার্যক্ষমতা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। 

আসুন জেনে নেই মাত্র ২০ টাকা খরচ করে পুরো ১ বছর মশার উপদ্রব থেকে মুক্ত থাকতে পারবেন। 

কিভাবে বানাবেন? 
প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো সবার আগে একসাথে যোগাড় করে নিন। 

উপাদানঃ – দুই লিটারের একটি প্লাস্টিকের বোতল – এক গ্লাসের তিন ভাগের দুই ভাগ ইষৎ গরম পানি – এক কাপের তিন ভাগের ২ ভাগ ব্রাউন সুগার – এক চামচ ইষ্ট ইষ্টঃ যেকোন সুপার স্টোর কিংবা বড় জেনারেল স্টোরগুলোতে ইস্টের বিভিন্ন সাইজের বোতল পাওয়া যায়। সেখান থেকে ক্রয় করে নিতে পারেন। ইস্ট সাধারণত এক প্রকার ছত্রাক তবে এই খাবার জিনিস তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয়। পাউরুটির তৈরির জন্য অন্যতম প্রয়োজনীয় উপাদান এই ইস্ট। 

প্রস্তুত প্রক্রিয়াঃ মশা থেকে মুক্ত থাকতে হলে আপনাকে প্রস্তুত প্রানালী ধাপে ধাপে অনুসরন করতে হবে। প্রথমে প্লাষ্টিকের বোতলটি উপর থেকে ৩/৪ ইঞ্চি রেখে একটি চাকু দিয়ে কেটে ফেলুন। তারপর নিচের বড় (বোতল) অংশটিতে ব্রাউন সুগার বা খোলা চিনা বা পরিশোধিত চিনি ঢেলে দিন। নাড়ানোর কোন প্রয়োজন নেই। তারপর এক কাপ ফুটানো পানি ঢালুন। তারপর এক চামচের তিন ভাগের দুই ভাগ ইষ্ট ছেড়ে দিন। এবার বোতলের উপরের অংশটিকে চিৎ করে বড় বোতলের ভেতর বসিয়ে দিন। খেয়াল রাখবেন বোতলের উপরের অংশের মুখের ছিপিটি যেন অবশ্যই খোলা রাখেন। কারন ওখান থেকেই মশা ভেতরে ঢুকবে। এরপর একটি টেপ দিয়ে বড় এবং ছোট অংশটির জোরা শক্ত করে লাগিয়ে দিন। ব্যস! হয়ে গেলো মশা মারার হোমমেড ফাঁদ। এবার ফাঁদটিকে ঘরের যেকোন কোনায় রেখে দিন। চলতে পারবেন পুরো এক বছর। 

সর্তকতাঃ বাচ্চাদের নাগালের বাইরে রাখুন। যাতে তারা ভুলে খেয়ে না ফেলে


Wednesday, February 17, 2016

যে আওয়াজ অন্যকে কষ্ট দেয়

অন্যকে কষ্ট দেওয়া ভালো কাজ নয়। প্রকৃত মুসলিম তো সেই যার দ্বারা অন্যে কষ্ট পায় না। দৈনন্দিন চলাফেরায় আমার দ্বারা যেন কেউ কষ্ট না পায়এ চেষ্টা সকলেরই কিছু না কিছু থাকে। কিন্তু কিছু বিষয় আছেযার দ্বারা অন্যে কষ্ট পায় ঠিকই কিন্তু আমি উপলব্ধি করতে পারি না। এর তালিকা তো দীর্ঘএখানে শুধু কয়েকটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। আল্লাহ আমলের তাওফিক দিন।
চেয়ার-টেবিল সরানোর সময় যে আওয়াজ হয় তা যে কত কষ্টদায়ক তা আমি সরালে বুঝতে পারি না। কিন্তু আমি ঘুমে থাকলে বা কোনো কাজে মগ্ন থাকলে বুঝতে পারিএ আওয়াজ কত কষ্টদায়ক। আর যদি ভবনের উপর তলায় কেউ (উঁচু করা ছাড়া) ঠেলা দিয়ে কাঠের চেয়ার বা টেবিল সরায় এতে যে কী বিরক্তিকর আওয়াজ হয়আমি নিচ তলার বাসিন্দা হলে তা বুঝতে পারবো। এগুলো আমাকে যেমন কষ্ট দেয়অন্যেও এর দ্বারা কষ্ট পায়।
মসজিদ থেকে একে একে বের হচ্ছে আর হাত থেকে যমীনের উপর ঠাস ঠাস আওয়াজে জুতা ফেলছে। যারা বের হচ্ছেন তাদের কাছে এটা তেমন কিছু মনে হচ্ছে না বা খেয়াল করছেন না। কিন্তু যিনি নামাযে আছেন তার কাছে আওয়াজটি খুবই বিরক্তিকর লাগছে এবং নামাযের ব্যাঘাত ঘটছে। আর নামায বা মসজিদ বলে কথা নয়এভাবে আওয়ায করে জুতা-সেন্ডেল যমীনে ফেলা ভদ্রতা পরিপন্থীও বটে।
তেমনি আরেকটি বিষয় হলসশব্দে দরজা বন্ধ করা। আমার দরজা বন্ধের আওয়াযে হতে পারে কারো কাঁচা ঘুম ভেঙে গেলআর ঘুমই আসছে না বা মা অনেক কষ্টে শিশুকে ঘুম পাড়িয়েছেন কিন্তু আমার কারণে শিশুটির ঘুম ভেঙে গেলমা কষ্ট পেলেন।
তো এই যে আমার দ্বারা অন্যের কষ্ট পাওয়াএকটু সচেতনতাই এ থেকে আমাকে বাঁচাতে পারে। এবং এ থেকে বাঁচার আরো বড় উপায় হলযে যে ক্ষেত্রে অন্যের আচরণে আমি কষ্ট পায় ঐ সকল স্থানে আমার থেকে যেন কেউ কষ্ট না পায় সে বিষয়ে সতর্ক হওয়া।  

Ref: http://www.alkawsar.com/article/1773

Tuesday, February 16, 2016

বি. বাড়িয়ার ঘটনা : এমন যেন আর না ঘটে

অতি সম্প্রতি বি. বাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী জামেয়া ইউনুসিয়া মাদরাসায় ঘটে যাওয়া লোমহর্ষক ঘটনাটি খুব ঠাণ্ডা মাথায় বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। একটি বিবাদের জের ধরে গভীর রাতে একটি দ্বীনী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে ঘুমন্ত ছাত্রদের উপর হামলা করা এবং একজন হাফেযে কুরআনকে উপরতলা থেকে  নীচে ফেলে দেওয়ার ঘটনা খুব সাধারণ ঘটনা নয়।
এই ঘটনা এবং আগে-পরের ঘটনা-প্রবাহে সব পক্ষের জন্য চিন্তা ও উদ্বেগের ব্যাপার রয়েছে। এখানে প্রথম প্রশ্ন হচ্ছেএকজন মুসলিমের মাধ্যমে Ñযদি সে মুসলিম হয়ে থাকেÑ এই পাশবিক ঘটনা কীভাবে ঘটতে পারে?তাহলে মুসলমানেরই একটি শ্রেণিকে আজ কোথায় নামিয়ে আনা হয়েছে!
এই প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো প্রতিষ্ঠানও নয় এবং এগুলোর কার্যক্রমে লুকোছাপার কোনো কিছু নেই। প্রায় প্রতিটি কওমী মাদরাসায় পাঞ্জেগানা ও জুমা মসজিদ রয়েছে। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাযে,জুমা-জানাযায়দুই ঈদেতারাবীতে ও নানা ধর্মীয় অনুষঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানে মহল্লাবাসীর ব্যাপক ও উন্মুক্ত উপস্থিতি রয়েছে। বাংলাদেশের আর কোনো ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সর্বস্তরের মানুষের জন্য এত উন্মুক্ত নয়।
একইভাবে এসব প্রতিষ্ঠান বিশেষ কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠির মাধ্যমেও পরিচালিত নয়। এখানে সকল শ্রেণি-পেশার এবং সকল মত ও পথের দ্বীনদার মানুষের অংশগ্রহণ রয়েছে। এই মাদরাসাগুলোর ছাত্র-শিক্ষকদের পারিবারিক প্রেক্ষাপটও বিশেষ কোনো শ্রেণি-পেশা বা রাজনৈতিক পরিচয়ের নয়। এখানে একতার একমাত্র সূত্র হচ্ছে ইলম ও ইলমের সেবা এবং ইসলাম ও ইসলামপ্রিয়তা। একারণে শত প্রচারণার পরও তৃণমূল পর্যায়ের জনসাধারণের মনে এসকল মাদরাসার প্রতি রয়েছে অপরিসীম দরদ ও শ্রদ্ধা। এই সাধারণ ধারার বাইরে কিছু মানুষের মনে কীভাবে ও কেন এই জিঘাংসাপূর্ণ ও মারমুখী মানসিকতা তৈরি হচ্ছে তা খুব গভীরভাবে ভেবে দেখা প্রয়োজন। অথচ ঐ মানুষগুলোও মুসলমান। পাঁচ ওয়াক্ত নামাযেজুমায়-ঈদে তারাও এই মাদরাসা-মসজিদগুলোতে অথবা এই সকল মাদরাসার সন্তানদের পিছনেই ইক্তেদা করে থাকেন। এঁদেরই মুখে দ্বীন-ধর্মের ব্যাখ্যা শোনেন এবং জীবনের নানা বিষয়ে এঁদেরই দুআ ও পরামর্শ গ্রহণ করেন। একটি সিন্ডিকেটেড প্রচারণা যে ঐক্যের বহু সূত্র ও বন্ধন সত্তে¡ও কীভাবে একটি জাতিকে চিন্তা ও কর্মে বিভক্ত করে ফেলতে পারেÑ এ তারই একটি দৃষ্টান্ত। মিডিয়ার প্রচারণাকে যারা মনোযোগের ব্যাপার বলে মনে করেন না তাদের জন্য এসকল ঘটনায় চিন্তার উপাদান রয়েছে। ধীরে ধীরে মুসলমানেরই একটি শ্রেণিকে কীভাবে চরম মুসলিম-বিদ্বেষী ও ইসলাম-বিদ্বেষী করে গড়ে ফেলা হচ্ছেÑ তা আমাদের সকল পক্ষকেই গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে।
দ্বিতীয়তআমাদের এই ছোট্ট দেশখানিপৃথিবী নামক গ্রহটিরই একটি অংশ। যত ছোটই হোকএই দেশটির নানা ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যের একটি হচ্ছেএর বিপুল সংখ্যক ধর্মপ্রাণ ইসলামপ্রিয় জনগোষ্ঠী। তাই এই দেশ-জাতিও চলমান বৈশ্বিক তৎপরতা বা অপতৎপরতা থেকে মুক্ত নয়। আল্লাহ তাআলা ইলমে দ্বীনের সাথে আমাদের যাদেরকে যুক্ত করেছেন আমাদের বিম্মৃত হলে চলবে না যেইলমে দ্বীনের মানসিবটির কারণেই আমরা আমাদের চারপাশের কিছু লোকের বিশেষ মনোযোগের লক্ষ্যবস্তু। সুতরাং নিজেদের স্বার্থেদ্বীন ও ইলমে দ্বীনের স্বার্থে এবং এই জাতি ও উম্মাহর স্বার্থে আমাদের ছোট-বড় প্রত্যেকের চড়ান্ত সতর্কতা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দেয়া অতি প্রয়োজন। আমাদের মনে রাখতে হবে যেএকটি ছোট্ট ঘটনার পর বড় বড় যে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাবলী ঘটতে থাকে তা আর নিয়ন্ত্রণের ভিতরে থাকে না। মনোযোগী’ লোকেরা এসময় তাদের পূর্ব-পরিকল্পিত কর্মকাРবাস্তবায়নের সুযোগ পেয়ে যায়। অথচ সব দায় এসে পড়ে ঐ ছোট্ট ঘটনাটির উপর। দেশে-বিদেশে এই কটকৌশল ইতিমধ্যে বড় বড় সাফল্য’ অর্জন করেছে বলে অনেকেই মনে করেন। সুতরাং সব ধরনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ উসকানীর মুখেও আমাদের কর্তব্যইসলামী আচরণবিধি থেকে বিচ্যুত না হওয়া। দাঈর আচরণগত সামান্য ভুলও দাওয়াতের জন্য চরম ক্ষতিকর সাব্যস্ত হতে পারে। এবং প্রচারণাকারীদের নানা অসত্য প্রচারণার সুযোগ করে দিতে পারে। সংযম ও সতর্কতার অর্থ কর্মহীন থাকা নয়। ইতিবাচক ধারায় সুচিন্তিত ও ধারাবাহিক কর্ম-প্রয়াস এখন সময়ের দাবি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কিছু কিছু মিডিয়া ও প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক কর্ম-প্রয়াস খুব নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করা দরকার। আমাদের পঠন-পাঠনগত দায়িত্বের পাশাপাশি সর্বস্তরের জনগণের মাঝে সহীহ দাওয়াতী কাজের প্রসার ঘটানো এবং অজ্ঞতাবশত যারা বিরূপ তাদের মাঝেও সচেতনতা ও ভুল ধারণা অপনোদন প্রচেষ্টা এখন অতি প্রয়োজন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সকল শ্রেণিপেশা ও রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সকল মুসলমানকে খাঁটি মুসলমান হওয়ার তাওফীক দান করুন। আমীন।
http://www.alkawsar.com/article/1752

Saturday, February 13, 2016

যে সব আমলে আল্লাহ তাঁর বান্দার রিজিক বাড়িয়ে দেন

যে সব আমলে আল্লাহ তাঁর বান্দার রিজিক বাড়িয়ে দেন
জীবিকার জন্য অযথা অস্থিরতা কাম্য নয়। সবাই তার বরাদ্দকৃত সময় ও জীবিকা শেষ করেই দুনিয়া থেকে বিদায় হবে। ইবনে আদম দুনিয়ায় আসার আগেই আল্লাহ তায়ালা তার জীবিকা লিখে রেখেছেন। ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকে তার মায়ের পেটে ৪০ দিন শুক্র হিসেবে থাকে। অতঃপর রক্তপিন্ড হয়ে থাকে। অতঃপর মাংসপি রূপান্তরিত হয়। এরপর তার কাছে ফেরেশতা পাঠানো হয়, সে তার মাঝে রুহ প্রবেশ করে আর তাকে চারটি বিষয় লিখে দেয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়- জীবিকা, তার সময় বা বয়স এবং সে কি সৌভাগ্যবান না দুর্ভাগ্যবান।’ (বোখারি মুসলিম)। কিছু আমল রয়েছে, যা রিজিক বাড়ায়। জীবিকার ক্ষেত্রে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা এর শিক্ষা দিয়েছেন।


শরিয়ত এসব আমলের ব্যাপারে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করেছে। এসব আমলের মাঝে সর্বপ্রথম হচ্ছে তাকওয়া অর্জন করা। অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করা। যে আল্লাহকে ভয় করবে, তাকওয়া অর্জন করবে, আল্লাহ তায়ালা তাকে এমনভাবে রিজিক দান করবেন যে, সে তা ভাবতেও পারবে না। আর আল্লাহ তায়ালার অঙ্গীকার সত্য। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য নিষ্কৃতির পথ করে দেন এবং তাকে তার ধারণাতীত জায়গা থেকে রিজিক দেবেন।’ (সূরা তালাক : ২-৩)। এমনভাবে তাকে জীবিকা দান করবেন যে, সে ধারণাও করতে পারবে না।

যে জায়গার ব্যাপারে তার আশা-প্রত্যাশাও ছিল না। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, ‘আর যদি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং পরহেজগারি অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নেয়ামতগুলো উন্মুক্ত করে দিতাম।’ (সূরা আরাফ : ৯৬)। বান্দা তার পালনকর্তাকে ভয় করবে গোপনে এবং প্রকাশ্যে। ভয় করবে তার নিজের ক্ষেত্রে, তার পরিবার-পরিজন, অর্থ-সম্পদ, কাজকর্ম ও তার সব কাজের ক্ষেত্রে। রিজিক বাড়ে এমন আমলের মধ্যে আরেকটি হচ্ছে, অধিক পরিমাণে এস্তেগফার পড়া এবং তা নিয়মিত করা। আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবী নুহ (আ.) এর কথা বলতে গিয়ে বলেন, ‘অতঃপর বলেছি, তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা প্রার্থনা করো। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল।

তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বাড়িয়ে দেবেন, তোমাদের জন্য উদ্যান স্থাপন করবেন এবং তোমাদের জন্য নদীনালা প্রবাহিত করবেন।’ (সূরা নুহ : ১০-১২)। অন্যদিকে হুদ (আ.) এর কথা বলতে গিয়ে এরশাদ করেন, ‘আর হে আমার কওম! তোমাদের পালনকর্তার কাছে তোমরা ক্ষমা প্রার্থনা করো, অতঃপর তারই প্রতি মনোনিবেশ করো; তিনি আসমান থেকে তোমাদের ওপর বৃষ্টিধারা প্রেরণ করবেন এবং তোমাদের শক্তির ওপর শক্তি বৃদ্ধি করবেন, তোমরা কিন্তু অপরাধীদের মতো বিমুখ হইও না।’ (সূরা হুদ : ৫২)। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি অধিক পরিমাণে এস্তেগফার পড়বে আল্লাহ তায়ালা তাকে সব দুশ্চিন্তা ও সঙ্কটাপন্ন অবস্থা থেকে মুক্ত করে দেবেন এবং ধারণাতীতভাবে তাকে জীবিকা দান করবেন।’ (আবু দাউদ)। কুরতুবি (রহ.) বলেন, ‘এতে বোঝা যায়, এস্তেগফারে রিজিক বাড়ে এবং বৃষ্টি বর্ষিত হয়।’ জীবিকার প্রধান একটি বিষয় হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার ওপর যথাযথ ভরসা করা। হৃদয় মাওলার সঙ্গে যুক্ত থাকবে। সব ক্ষেত্রে তাঁর কাছেই সমর্পণ করবে।

যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার ওপর ভরসা করবে, সে তার সব প্রয়োজনের জন্য যথেষ্ট এবং তার সব অকল্যাণ ও ক্ষতিকর বিষয় তিনি প্রতিহত করবেন এবং ধারণাতীতভাবে তাকে জীবিকা দান করবেন। হাদিসে এসেছে, ‘যদি তোমরা আল্লাহ তায়ালার ওপর সঠিক ও যথাযথভাবে ভরসা করো, তাহলে তিনি তোমাদের পাখির মতো জীবিকা দান করবেন, ক্ষুধার্ত অবস্থায় সবাই বের হয় আর পেটপূর্তি করে বিকালে বাসায় ফিরে।’ (আহমাদ, তিরমিজি)। ইবনে রজব (রহ.) বলেন, ‘তাওয়াক্কুল ও ভরসার ক্ষেত্রে হাদিসটি মূলনীতি হিসেবে গৃহীত। আর তাওয়াক্কুল ও ভরসা জীবিকার বিভিন্ন আমল ও মাধ্যমের অন্যতম।’ পূর্বসূরিদের অনেকে বলতেন, ‘আল্লাহর ওপর ভরসা করো তাহলে কোনো কষ্ট-ক্লেশ ছাড়াই তোমার রিজিকের ব্যবস্থা হবে।’ এক্ষেত্রে একটি বিষয় ভালো করে জানা প্রয়োজন যে, মাধ্যম গ্রহণ করা বা কোনো কিছু পাওয়ার জন্য চেষ্টা করা তাওয়াক্কুল বা ভরসার পরিপন্থী নয়, বরং জ্ঞানী আলেম-ওলামারা বলেন, প্রচেষ্টা করা এবং মাধ্যম গ্রহণ করাই হচ্ছে আল্লাহর আনুগত্য।

আর হৃদয় দিয়ে ভরসা করা তার প্রতি ঈমানের নামান্তর। আর মাধ্যম গ্রহণ করার ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, ‘তিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীকে সুগম করেছেন, অতএব তোমরা তার কাঁধে বিচরণ করো এবং তার দেয়া রিজিক আহার করো।’ (সূরা মুলক : ১৫)। ‘কেউ কেউ আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধানে দেশে-বিদেশে যাবে।’ (সূরা মুজ্জাম্মিল : ২০)। ওমর (রা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ যেন জীবিকার সন্ধান না করে বসে বসে এ কথা না বলে, হে আল্লাহ আমাকে রিজিক দাও, কারণ তোমরা জান আকাশ কখনও স্বর্ণ-রুপা বর্ষণ করে না।’ বরকতময় জীবিকা পাওয়ার আরেকটি অন্যতম সূত্র হচ্ছে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা। হাদিসে এসেছে, ‘যার জীবিকার প্রসারতা ও জীবনের ব্যাপ্তি তাকে আনন্দিত করে, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (বোখারি)। আল্লাহ তায়ালার হেকমত ও অনুগ্রহের মধ্যে এটি একটি যে, তিনি দান-সদকা ও আল্লাহর পথে খরচ করার মধ্যেও অফুরন্ত জীবিকার ব্যবস্থা রেখেছেন।

তাই যে আল্লাহর রাস্তায় খরচ করবে তিনি তার বিপরীতে তাকে দান করেন এবং তার কাছে যা আছে তাতে বরকত দান করেন। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, ‘তোমরা যা কিছু ব্যয় করো, তিনি তার বিনিময় দেন। তিনি উত্তম রিজিকদাতা।’ (সূরা সাবা : ৩৯)। দুনিয়াতে আল্লাহ তায়ালা এর পরিবর্তে কিছু দিয়ে এবং তাতে বরকত দিয়ে এর বিনিময় দান করেন। আর আখেরাতে উত্তম প্রতিদান ও বিশাল সওয়াবের মাধ্যমে বিনিময় দান করেন। কোরআনে এসেছে, ‘শয়তান তোমাদের অভাব-অনটনের ভীতি প্রদর্শন করে এবং অশ্লীলতার আদেশ দেয়। পক্ষান্তরে আল্লাহ তোমাদের নিজের পক্ষ থেকে ক্ষমা ও বেশি অনুগ্রহের ওয়াদা করেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সুবিজ্ঞ।’ (সূরা বাকারা : ২৬৮)। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘দুইটি বিষয় আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর দুইটি বিষয় শয়তানের পক্ষ থেকে। শয়তান অভাব-অনটনের ভয় দেখায়, আর বলে দান করো না, নিজের কাছে রেখে দাও। ভবিষ্যতে তোমার প্রয়োজন হবে। আর অশ্লীলতার আদেশ দেয়। অন্যদিকে আল্লাহ তায়ালা গোনাহ ও পাপের জন্য ক্ষমার ওয়াদা করেন এবং রিজিকে অনুগ্রহের অঙ্গীকার করেন।’ তাই বেশি করে দান করা চাই। এতে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশাল ও ব্যাপক বিনিময়ের সুসংবাদ রয়েছে।

হিজাব ও পর্দা : কিছু সহজ-সরল কথা

পর্দা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধান। কুরআন মজীদের কয়েকটি সূরায় পর্দা-সংক্রান্ত বিধান দেওয়া হয়েছে। পর্দার বিষয়ে আল্লাহ তাআলা সকল শ্রেণীর ঈমানদার নারী-পুরুষকে সম্বোধন করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আদেশ করেছেন তিনি যেন তাঁর স্ত্রীদেরকে, কন্যাদেরকে এবং মুমিনদের নারীদেরকে চাদর দ্বারা নিজেদেরকে আবৃত রাখার আদেশ দেন। কিছু আয়াতে উম্মুল মুমিনীনদেরকেও সম্বোধন করেছেন, কোনো কোনো আয়াতে সাহাবায়ে কেরামকেও সম্বোধন করা হয়েছে। মোটকথা, কুরআন মজীদ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মুসলিম নারী ও পুরুষের জন্য পর্দার বিধান দান করেছে। এটি শরীয়তের একটি ফরয বিধান। এ বিধানের প্রতি সমর্পিত থাকা ঈমানের দাবি। কিন্তু বেদনার বিষয় এই যে, পশ্চিমা সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রভাবে আমাদের মুসলিম-সমাজ এতটাই প্রভাবিত হয়ে পড়েছে যে, কুরআন ও সুন্নাহর বিধানও তাদের কাছে অপরিচিত ও অপ্রয়োজনীয়! (নাউযুবিল্লাহ) ইসলামের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধান তো-আল্লাহ হেফাযত করুন-মুসলিম পরিচয় বহনকারীদের দ্বারা আক্রমণেরও শিকার। ঐসব বিধানের মধ্যে একটি হচ্ছে পর্দা বিধান। এই সবমুসলমানদের কে বোঝাবে যে, এটা নিজের পায়ে কুঠারাঘাতের শামিল। ইসলামের এই বিধানগুলো শুধু আমাদের আখেরাতে নাজাতেরই উপায় নয়, আমাদের দুনিয়ার জীবনের শান্তি, স্বস্থি ও পবিত্রতারও রক্ষাকবচ। কিন্তু ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতা ও অমুসলিমদের প্রচারণায় প্রভাবিত হয়ে আমরা নিজেদের আর্দশ ত্যাগ করে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছি। আমাদের পরিবার ও সমাজেও পশ্চিমা সমাজের ভয়াবহ উপসর্গগুলো প্রকটভাবে দেখা দিয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে অশনিসংকেত। পশ্চিমা সভ্যতা যেসব মরণব্যাধিতে আক্রান্ত তা থেকে যদি আমরা আমাদের পরিবার ও সমাজকে রক্ষা করতে চাই তার একমাত্র উপায় ইসলামের বিধান ও আদর্শের সামনে আত্মসমর্পণ। আমরা যদি আমাদের পরিবারিক শান্তি ফিরে পেতে চাই তাহলে নারী-পুরুষ সকলকে পর্দা-বিধানের অনুসারী হতে হবে।

মুসলিম ভাইবোনদের প্রতি কল্যাণকামিতা থেকেই আমরা বিভিন্ন আয়োজন করছি। বর্তমান সংখ্যায় পর্দা সম্পর্কে সহজ-সরল কয়েকটি নিবন্ধ পত্রস্থ হল। সামনে এ বিষয়ে আরো কিছু পেশ করার ইচ্ছা আছে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে তাঁর বান্দা হওয়ার তাওফীক দান করুন। আমীন।-সম্পাদক


পর্দা : বিধান ও কল্যাণ
মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ফাহাদ
পর্দা-বিধান ইসলামী শরীয়তের পক্ষ থেকে সাধারণভাবে সমাজ-ব্যবস্থার এবং বিশেষভাবে উম্মতের মায়েদের জন্য অনেক বড় ইহসান। এই বিধানটি মূলত ইসলামী শরীয়তের যথার্থতা, পূর্ণাঙ্গতা ও সর্বকালের জন্য অমোঘ বিধান হওয়ার এক প্রচ্ছন্ন দলিল। পর্দা নারীর মর্যাদার প্রতীক এবং ইফফাত ও পবিত্রতার একমাত্র উপায়।
অনেকে মনে করেন, পর্দা-বিধান শুধু নারীর জন্য। এ ধারণা ঠিক নয়। পুরুষের জন্যও পর্দা অপরিহার্য। তবে উভয়ের পর্দার ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে। যে শ্রেণীর জন্য যে পর্দা উপযোগী তাকে সেভাবে পর্দা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
যে কোনো ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তিই কুরআন-সুন্নাহর পর্দা সম্পর্কিত আয়াত ও হাদীসসমূহ গভীরভাবে অধ্যয়ন করলে এই বাস্তবতা স্বীকার করবেন যে, ইসলামে পর্দার বিধানটি অন্যান্য হিকমতের পাশাপাশি নারীর সম্মান ও সমাজের পবিত্রতা রক্ষার জন্যই দেওয়া হয়েছে। এজন্য এই বিধানের কারণে প্রত্যেককে ইসলামের প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত। কৃতঘ্ন হয়ে এ বিধান সম্পর্কে অযথা আপত্তি করা উচিত নয়।
আকবর এলাহাবাদী বলেন-
প্রাশ্চাত্যের ও প্রাশ্চাত্য প্রভাবিত পুরুষদের অন্তরে পর্দা পড়ে যাওয়ার কারণে তারা এই বাস্তবতা অনুধাবন করতে না পারলেও আজকের পশ্চিমা নারীরা এ বিষয়টি অনুধাবন করতে পারছে। আর এই বিধানটিই তাদেরকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার মাধ্যম হয়েছে।
আমি পূর্বেই বলেছি, নারী-পুরুষ উভয়ের পবিত্রতা রক্ষার অতি সহজ ও কার্যকর উপায় হল ইসলামের পর্দা বা হিজাব বিধান। এই বিধানের অনুসরণের মাধ্যমেই হৃদয়-মনের পবিত্রতা অর্জন করা সম্ভব। পর্দার এই সুফল স্বয়ং আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন। ইরশাদ হয়েছে-
ذلكم اطهر لقلوبكم وقلوبهن
  এই বিধান তোমাদের ও তাদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্রতার কারণ। (সূরা আহযাব (৩৩) : ৫৩)
সুতরাং মানবসমাজকে পবিত্র ও পঙ্কিলতামুক্ত রাখতে পর্দা-বিধানের কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে বর্তমান সমাজের যুবক ও তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা ও নারীজাতির নিরাপত্তার জন্য পর্দা-বিধানের পূর্ণ অনুসরণ এখন সময়ের দাবি।
পর্দা-বিধান কুরআন মজীদে
পর্দার বিধানটি ইসলামের একটি অকাট্য বিধান। কুরআন মজীদের অনেকগুলো আয়াতে এই বিধান দেওয়া হয়েছে। সুতরাং কোনো ঈমানদারের পক্ষে এই বিধানকে হালকা মনে করার সুযোগ নেই। এখানে কয়েকটি আয়াত সংক্ষিপ্ত আলোচনাসহ তুলে ধরা হল।
এক.
يا ايها النبى قل لازواجك وبناتك ونساء المؤمنين ...
  হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীগণকে, কন্যাগণকে ও মুমিনদের নারীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজ হবে। ফলে তাদের উত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা আহযাব : ৫৯)
আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, আল্লাহ তাআলা মুমিন নারীদেরকে আদেশ করেছেন যখন তারা কোনো প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হবে তখন যেন মাথার উপর থেকে ওড়না/চাদর টেনে স্বীয় মুখমন্ডল আবৃত করে। আর (চলাফেরার সুবিধার্থে) শুধু এক চোখ খোলা রাখে।-ফাতহুল বারী ৮/৫৪, ৭৬, ১১৪
ইবনে সীরিন বলেন, আমি (বিখ্যাত তাবেয়ী) আবীদা (সালমানী রাহ.)কে উক্ত আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, কাপড় দ্বারা মাথা ও চেহারা আবৃত করবে এবং এক চোখ খোলা রাখবে।
দুই.
واذا سألتموهن فسئلوهن من وراء حجاب ...
তোমরা তাঁদের (নবী পত্নীদের) নিকট কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাও। এই বিধান তোমাদের ও তাদের হৃদয়ের জন্য অধিকতর পবিত্রতার কারণ। তোমাদের কারো জন্য আল্লাহর রাসূলকে কষ্ট দেওয়া সংগত নয় এবং তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পত্নীদেরকে বিবাহ করা তোমাদের জন্য কখনো বৈধ নয়। আল্লাহর দৃষ্টিতে এটা ঘোরতর অপরাধ। (সূরা আহযাব (৩৩) : ৫৩)
এই আয়াত থেকেও বোঝা যায়, নারীর দেহের কোনো অংশই পর্দা-বিধানের বাইরে নয়। উম্মুল মুমিনীনগণের আমলও তা প্রমাণ করে।
এই আয়াতে যখন পর্দার বিধানকে সাহাবায়ে কেরাম ও উম্মুল মুমিনীনদের জন্যও অধিকতর পবিত্রতার উপায় বলা হয়েছে তখন উম্মতের আর কে আছে যে এই বিধানের বাইরে থাকতে পারে?
তিন.
قل للمؤمنت يغضنن من ابصارهن ويحفظن فروجهن ولا يبدين زينتهن الا ما ظهر منها
তরজমা : (হে নবী!) মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে ও তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে। তারা যেন সাধারণত যা প্রকাশ থাকে তা ছাড়া নিজেদের আভরণ প্রদর্শন না করে। (সূরা নূর : ৩১)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত আছে যে, সাধারণত যা প্রকাশিতঅর্থ হচ্ছে কাপড়।-তাফসীরে তাবারী ১৮/১১৯
এই ব্যাখ্যা অনুসারে প্রতীয়মান হয় যে, গায়রে মাহরাম পুরুষের সামনে নারীর মুখমন্ডলসহ পূর্ণ দেহ আবৃত রাখা অপরিহার্য।
চার.
وليضربن بخمرهن على جيوبهن
তরজমা : তারা যেন গ্রীবা ও বক্ষদেশ মাথার কাপড় দ্বারা আবৃত করে। ... (সূরা নূর : ৩১)
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. বলেন,
يرحم الله نساء المهاجرات الأول، لما أنزل الله : وليضربن بخمرهن على جيوبهن شققن مورطهن فاختمرن بها.
অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা প্রথম শ্রেণীর মুহাজির নারীদের প্রতি দয়া করুন। আল্লাহ তাআলা যখন
وليضربن بخمرهن على جيوبهن
আয়াত নাযিল করলেন তখন তারা নিজেদের চাদর ছিঁড়ে তা দ্বারা নিজেদেরকে আবৃত করেছিলেন।-সহীহ বুখারী ২/৭০০
উপরোক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. বলেন-ফাখতামারনা অর্থ তারা মুখমন্ডল আবৃত করেছেন।-ফাতহুল বারী ৮/৩৪৭
আল্লামা আইনী রাহ. বলেন-ফাখতামারনা বিহা অর্থাৎ যে চাদর তারা ছিঁড়ে ফেলেছিলেন তা দিয়ে নিজেদের মুখমন্ডল আবৃত করলেন। (উমদাতুল কারী ১৯/৯২)
আল্লামা শানকীতী রাহ. বলেন, এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, উপরোক্ত মহিলা সাহাবীগণ বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে মুখমন্ডল আবৃত করারও আদেশ করেছেন। তাই তারা আল্লাহ তাআলার আদেশ পালনার্থে নিজেদের চাদর ছিঁড়ে তা দিয়ে মুখমন্ডল আবৃত করেছেন।
পাঁচ.
ولا يضربن بارجلهن ليعلم ما يخفين من زينتهن وتوبوا الى الله جميعا ايه المؤمنون لعلهم تفلحون
(তরজমা) তারা যেন তাদের গোপন আভরণ প্রকাশের উদ্দেশ্যে সজোরে পদক্ষেপ না করে। হে মুমিনগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। (সূরা নূর :  ৩১)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, পরপুরুষকে আকৃষ্ট করে এমন সব কাজ থেকে বিরত থাকা ঈমানদার নারীর কর্তব্য। কারণ পরপুরুষকে নুপুরের আওয়াজ শোনানোর উদ্দেশ্যে সজোরে পদবিক্ষেপ যখন নিষেধ করা হয়েছে তখন যে সকল কাজ, ভঙ্গি ও আচরণ এর চেয়েও বেশি আকৃষ্ট করে তা নিষিদ্ধ হওয়া তো সহজেই বোঝা যায়। মুসলিম নারীদের জন্য এটি আল্লাহ রাববুল আলামীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
পর্দার বিধান হাদীস শরীফে
১. আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
নারী হল সতর তথা আবৃত থাকার বস্ত্ত। নিশ্চয়ই সে যখন ঘর থেকে  বের হয় তখন শয়তান তাকে মনোযোগ দিয়ে দেখতে থাকে। আর সে যখন গৃহাভ্যন্তরে অবস্থান করে তখন সে আল্লাহ তাআলার সবচেয়ে বেশি নিকটে থাকে।-আলমুজামুল আওসাত, তবারানী
এই হাদীস দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, বিনা প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়া উচিত নয়।
২. আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
ইহরাম গ্রহণকারী নারী যেন নেকাব ও হাতমোজা পরিধান না করে। (সহীহ বুখারী ৪/৬৩, হাদীস : ১৮৩৮)
কাযী আবু বকর ইবনে আরাবী বলেন, নারীর জন্য বোরকা দ্বারা মুখমন্ডল আবৃত রাখা ফরয। তবে হজ্বের সময়টুকু এর ব্যতিক্রম। কেননা, এই সময় তারা ওড়নাটা চেহারার উপর ঝুলিয়ে দিবে, চেহারার সাথে মিলিয়ে রাখবে না। পরপুরুষ থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখবে এবং পুরুষরাও তাদের থেকে দূরে থাকবে। (আরিযাতুল আহওয়াযী ৪/৫৬)
৩. আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
যে ব্যক্তি অহঙ্কারবশত কাপড় ঝুলিয়ে রাখে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তার দিকে (রহমতের দৃষ্টিতে) তাকাবেন না। তখন উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা রা. জিজ্ঞাসা করলেন, তাহলে মহিলারা তাদের কাপড়ের ঝুল  কীভাবে রাখবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এক বিঘত ঝুলিয়ে রাখবে। উম্মে সালামা বললেন, এতে তো তাদের পা অনাবৃত থাকবে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে এক হাত ঝুলিয়ে রাখবে, এর বেশি নয়। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৪১১৭; জামে তিরমিযী ৪/২২৩; সুনানে নাসাঈ ৮/২০৯; মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ১১/৮২
ইমাম তিরমিযী বলেন, এই হাদীসে নারীর জন্য কাপড় ঝুলিয়ে রাখার অবকাশ দেওয়া হয়েছে। কারণ এটিই তাদের জন্য অধিক আবৃতকারী।
৪. ওকবা ইবনে আমের জুহানী রা.-এর সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-তোমরা নারীদের নিকট যাওয়া থেকে বিরত থাক। এক আনসারী সাহাবী আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! স্বামী পক্ষীয় আত্মীয় সম্পর্কে আপনি কী বলেন? তিনি বললে, সে তো মৃত্যু। -সহীহ বুখারী ৯/২৪২; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ২১৭২; জামে তিরমিযী, হাদীস : ১১৭১; মুসনাদে আহমাদ ৪/১৪৯, ১৫৩
এই হাদীসে বেগানা নারী-পুরুষের একান্ত অবস্থানকে নিষেধ করা হয়েছে এবং এ প্রসঙ্গে স্বামী পক্ষীয় আত্মীয়-স্বজন যেমন দেবর-ভাসুর ইত্যাদির সাথে অধিক সাবধানতা অবলম্বনকে অপরিহার্য করা হয়েছে।
৫. হযরত আয়েশা রা. ইফ্কের দীর্ঘ হাদীসে বলেছেন-আমি আমার স্থানে বসে ছিলাম একসময় আমার চোখ দুটি নিদ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল এবং আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। সফওয়ান ইবনে মুয়াত্তাল আসসুলামী ছিল বাহিনীর পিছনে আগমনকারী। সে যখন আমার অবস্থানস্থলের নিকট পৌছল তখন একজন ঘুমন্ত মানুষের আকৃতি দেখতে পেল। এরপর সে আমার নিকট এলে আমাকে চিনে ফেলল। কারণ পর্দা বিধান অবতীর্ণ হওয়ার আগে সে আমাকে দেখেছিল। সে তখন ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন বলে ওঠে, যার দরুণ আমি ঘুম থেকে জেগে উঠি এবং ওড়না দিয়ে নিজেকে আবৃত করে ফেলি।
অন্য রেওয়ায়েতে আছে, আমি ওড়না দিয়ে আমার চেহারা ঢেকে ফেলি।-সহীহ বুখারী ৫/৩২০; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ২৭৭০; জামে তিরমিযী, হাদীস : ৩১৭৯
৬.  উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা রা. বলেন, আমি একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ছিলাম। উম্মুল মুমিনীন মায়মুনা রা.ও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এমন সময় আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম উপস্থিত হলেন। এটি ছিল পর্দা বিধানের পরের ঘটনা। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা তার সামনে থেকে সরে যাও। আমরা বললাম, তিনি তো অন্ধ, আমাদেরকে দেখছেন না?! তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরাও কি অন্ধ? তোমরা কি তাকে দেখছ না?-সুনানে আবু দাউদ ৪/৩৬১, হাদীস : ৪১১২; জামে তিরমিযী ৫/১০২, হাদীস : ২৭৭৯; মুসনাদে আহমাদ ৬/২৯৬; শরহুল মুসলিম, নববী ১০/৯৭; ফাতহুল বারী ৯/২৪৮
৭. উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. বলেন, আমরা যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ইহরাম অবস্থায় ছিলাম তখন আমাদের পাশ দিয়ে অনেক কাফেলা অতিক্রম করত। তারা যখন আমাদের সামনাসামনি চলে আসত তখন আমাদের সকলেই চেহারার ওপর ওড়না টেনে দিতাম। তারা চলে গেলে আবার তা সরিয়ে নিতাম।-মুসনাদে আহমাদ ৬/৩০; ইবনে মাজাহ,
হাদীস: ২৯৩৫
এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, পরপুরুষের সামনে চেহারা ঢেকে রাখা আবশ্যক।
৮. আসমা বিনতে আবু বকর রা. বলেন, আমরা পুরুষদের সামনে মুখমন্ডল আবৃত করে রাখতাম। ...-মুসতাদরাকে হাকেম ১/৪৫৪
এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, সাহাবা-যুগের সাধারণ মহিলারাও গায়র মাহরাম পুরুষ থেকে নিজেদের চেহারা আবৃত করতেন। কারণ আসমা বিনতে আবি বকর রা. এখানে বহুবচন ব্যবহার করেছেন। যা প্রমাণ করে উম্মুল মুমিনগণ ছাড়া অন্য নারীরাও তাদের মুখমন্ডল আবৃত রাখতেন।
৯. ফাতিমা বিনতে মুনযির রাহ. বলেন, আমরা আসমা বিনতে আবু বকর রা.-এর সাথে ইহরাম অবস্থায় থাকাকালে আমাদের মুখমন্ডল ঢেকে রাখতাম।-মুয়াত্তা, ইমাম মালেক ১/৩২৮; মুসতাদরাকে হাকেম ১/৪৫৪
হযরত ওমর রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-যখনই কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে একান্তে সাক্ষাত করে তখন তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান।-জামে তিরমিযী
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. বলেন, একজন মহিলা পর্দার পিছন থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাতে একটি কাগজ দিতে চাইল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাত গুটিয়ে নিলেন (কাগজটি নিলেন না এবং) বললেন, আমি জানি না, এটা কি পুরুষের হাত না নারীর। মহিলা আরজ করলেন, নারীর হাত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি যদি নারী হতে তাহলে নিশ্চয়ই নখে মেহেদী থাকত।-সুনানে আবু দাউদ, সুনানে নাসায়ী
এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, পীর-মুর্শিদ ও উস্তাদের সাথেও পর্দা করা অপরিহার্য।
হযরত উমাইমা বিনতে রুকাইকা রা. থেকে বাইয়াত সংক্রান্ত একটি দীর্ঘ হাদীসে আছে যে, নারীগণ বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমাদের প্রতি আমাদের নিজেদের চেয়েও মেহেরবান। সুতরাং আপনার হাত মোবারক দিন, আমরা বাইয়াত হই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি নারীদের সাথে হাত মিলাই না। (যা মুখে বলেছি তা মেনে চলাই তোমাদের জন্য অপরিহার্য)।-মুয়াত্তা মালিক
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. বলেন, আল্লাহর কসম! বাইয়াতের সময় তাঁর (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর) হাত কখনো কোনো নারীর হাত স্পর্শ করেনি। তিনি শুধু মুখে বলতেন, তোমাকে বাইয়াত করলাম।-সহীহ বুখারী ২/১০৭১
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
দুই শ্রেণীর দোযখী এখনও আমি দেখিনি। (কারণ তারা এখন নেই, ভবিষ্যতে আত্মপ্রকাশ করবে) এক শ্রেণী হচ্ছে ঐ সকল মানুষ, যাদের হাতে ষাঁড়ের লেজের মতো চাবুক থাকবে, যা দিয়ে তারা মানুষকে প্রহার করবে। (দ্বিতীয় শ্রেণী হচ্ছে) ঐ সকল নারী, যারা হবে পোশাক পরিহিতা, নগ্ন, আকৃষ্ট ও আকৃষ্টকারী; তাদের মাথা হবে উটের হেলানো কুঁজের ন্যায়। এরা জান্নাতে যাবে না এবং জান্নাতের খুশবুও পাবে না অথচ জান্নাতের খুশবু তো এত এত দূর থেকে পাওয়া যাবে।-মুসলিম ২/২০৫, হাদীস : ২১২৮
এই হাদীসে বেপর্দা নারীদের প্রতি কঠিন হুঁশিয়ারি শোনানো হয়েছে। সুতরাং তাদের মৃত্যুর আগেই তাওবা করে পর্দার বিধানের দিকে ফিরে আসা কর্তব্য।
উপরের আলোচনা থেকে জানা গেল যে, কুরআন মজীদে ও হাদীস শরীফে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্দার বিধান দেওয়া হয়েছে। এই বিধান মেনে চলা সকল ঈমানদার নারী-পুরুষের জন্য অপরিহার্য। এবার ঐ সকল নিকটাত্মীয়দের কথা উল্লেখ করছি, যাদের মাঝে পর্দার হুকুম নেই। এরা ছাড়া অন্য সকলের সাথেই পর্দা করতে হবে।
যাদের সাথে পর্দা নেই
মাহরাম পুরুষের সাথে নারীর পর্দা নেই। মাহরাম পুরুষ দ্বারা উদ্দেশ্য হল এমন পুরুষ আত্মীয়, যার সাথে বর্তমানে কিংবা ভবিষ্যতে কোনো অবস্থায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া জায়েয নয়। যেমন-পিতা, ভাই ইত্যাদি।
আর যে পুরুষের সাথে বর্তমানে কিংবা ভবিষ্যতে সাময়িক প্রতিবন্ধকতা (যেমন-নারীর বোন বা এমন নারীর বিবাহে থাকা, যাদের দুজনকে বিবাহসূত্রে একত্র করা জায়েয নয়) দূর হওয়ার পর বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া জায়েয সে হল গায়র-মাহরাম। তার সাথে পর্দা করা ফরয।
পুরুষের জন্য মাহরাম ও গায়র-মাহরাম নারী
একজন পুরুষের মাহরাম নারী হল এমন নারী, যার সাথে তার বর্তমানে কিংবা ভবিষ্যতে কোনো অবস্থায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া জায়েয নয়। যেমন-মা, মেয়ে ইত্যাদি।
পক্ষান্তরে যে নারীর সাথে তার বর্তমানে কিংবা ভবিষ্যতে সাময়িক প্রতিবন্ধকতা (যেমন-নারীর অন্য পুরুষের বিবাহে থাকা) দূর হওয়ার পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া জায়েয সে হল গায়র-মাহরাম।
মাহরামের প্রকারভেদ
সাধারণত তিন ধরনের সম্পর্ককে শরীয়ত মাহরাম হওয়ার কারণ সাব্যস্ত করেছে। যথা : ক) বংশীয়/ঔরসজাত সম্পর্ক। খ) দুধ সম্পর্ক ও গ) বৈবাহিক সম্পর্ক।
বংশগত সম্পর্কের কারণে মাহরাম নারীর বংশ সম্পর্কিত মাহরাম পুরুষগণ হলেন-১. পিতা, দাদা-নানা ও তদোর্ধ্ব পুরুষ। ২. পুত্র, পৌত্র ও তদস্তন পুরুষ। ৩. ভাই-সহোদর, বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয়। ৪. ভ্রাতুষ্পুত্র ও তদস্তন পুরুষ। ৫. ভাগ্নে (সহোদর, বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয় বোনের ছেলে)। ৬. চাচা।
৭. মামা।
আল্লাহ তাআলার বাণী-
ولا يبدين زينتهن الا لبعولتهن او ابآئهن او ابآء بعولتهن او ابنآئهن او ابنآء بعولتهن او اخوانهن او بنى اخوانهن او بنى اخوتهن او نسائهن او ما ملكت ايمانهن او التبعين غير اولى الاربة من الرجال او الطفط الذين لم يظهروا على عورت النساء
(তরজমা) তারা যেন নিজেদের আভরণ প্রকাশ না করে তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, আপন নারীগণ, তাদের মালিকানাধীন দাসী, পুরুষদের মধ্যে যারা যৌন কামনা-রহিত পুরুষ এবং নারীদের গোপন অঙ্গ সম্বন্ধে অজ্ঞ বালক ব্যতীত অন্য কারো নিকট। (সূরা নূর (২৪) : ৩১)
পুরুষের বংশ সম্পর্কিত মাহরাম নারীগণ হলেন-
১. মা ২. কন্যা ৩. ভগ্নী ৪. ফুফু, ৫. খালা ৬. ভ্রাতুষ্পুত্রী ৭. ভাগ্নী।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
حرمت عليكم امهتكم وبنتكم واخوتكم وعمتكم وخلتكم وبنت الاخ وبنت الاخت.
(তরজমা) তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে তোমাদের মা, কন্যা, ভগ্নী, ফুফু, খালা, ভ্রাতুষ্পুত্রী, ভাগ্নী। ... (সূরা নিসা (৪) : ২৩)
দুধ সম্পর্কের কারণে মাহরাম দুগ্ধপানের কারণেও মাহরাম সাব্যস্ত হয়ে থাকে। দুধ মা, দুধ কন্যা, দুধ বোন ইত্যাদি নারীগণ পুরুষের মাহরাম পরিগণিত হবেন। অনুরূপভাবে দুধ পিতা, দাদা ও তদোর্ধ্ব পুরুষ, দুধ পুত্র ও তদস্তন পুরুষ, দুধ ভাই ইত্যাদি পুরুষ নারীর মাহরাম হিসেবে গণ্য হবেন।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
حرمت عليكم امهتكم ... وامهتكم التى ارضعنكم واخوتكم من الرضاعة
(তরজমা) তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে তোমাদের মা ... দুধ-মা, দুধ বোন। ... (সূরা নিসা : (৪) : ২৩)
বিখ্যাত মুফাসসির আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে আহমদ কুরতুবী রাহ. এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন-
একজন নারী যদি কোনো শিশুকে দুধ পান করায় তাহলে সে দুগ্ধ পানকারীর জন্য হারাম হয়ে যায়। কারণ সে তার মা। তেমনি দুধমার মেয়ে, বোন হওয়ার কারণে; দুধমার বোন, খালা হওয়ার কারণে; দুধমার মা, নানী হওয়ার কারণে; দুধমার স্বামীর অন্য পক্ষের কন্যা, বোন হওয়ার কারণে; স্বামীর বোন, ফুফু হওয়ার কারণে; স্বামীর মা, দাদী হওয়ার কারণে ঐ শিশুর জন্য হারাম হয়ে যায়। তেমনি দুধমার ছেলে-মেয়ের সন্তানাদিও হারাম হয়ে যায়। কারণ তারা তার ভাই-বোনের
সন্তানাদি। (তাফসীরে কুরতুবী ৫/৭২)
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. বলেন, আবুল কুয়াইসের ভাই আফলাহ (যিনি আয়েশা রা.-এর দুধ চাচা) একবার আমার নিকট আসার অনুমতি চাইলেন। আমি অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানালাম। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে আসার পর তাঁকে ঘটনাটি জানালাম। তিনি আমাকে অনুমতি প্রদানের আদেশ করলেন।
মুসলিমের রেওয়ায়েত অনুযায়ী, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি তার সাথে পর্দা করো না। কেননা, বংশীয় সম্পর্কের দ্বারা যা হারাম হয়, দুধ সম্পর্ক দ্বারাও তা হারাম হয়।-সহীহ বুখারী ৮/৩৯২; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১৪৪৪; জামে তিরমিযী, হাদীস : ১১৪৭; সুনানে নাসায়ী ৬/৯৯
বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে মাহরাম
মাহরাম সাব্যস্ত হওয়ার তৃতীয় কারণ হল বিবাহ। বৈবাহিক সম্পর্কের দ্বারাও নারী-পুরুষ একে অপরের মাহরাম সাব্যস্ত হয়। নারীর বিবাহ সম্পর্কীয় মাহরাম পুরুষ হল স্বামীর পিতা (শ্বশুর), স্বামীর অন্য পক্ষের পুত্র ইত্যাদি। তেমনিভাবে নিজের শাশুড়ি, স্ত্রীর গর্ভজাত অন্য পক্ষের কন্যা ইত্যাদি নারীও পুরুষের জন্য মাহরাম গণ্য হবে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
وحرمت عليكم امهتكم ... وامهت نسائكم وربآئبكم التى فى حجوركم من نسائكم التى دخلتم بهن ...
(তরজমা) তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে তোমাদের মা, ... শাশুড়ি ও তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যাদের সাথে সংগত হয়েছ তার পূর্ব স্বামীর ঔরসে তার গর্ভজাত কন্যা, যারা তোমাদের অভিভাবকত্বে আছে।... (সূরা নিসা : ২৩)
ইমাম আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে আহমদ কুরতুবী রাহ. বলেন-বিবাহ সম্পর্কীয় মাহরাম নারী চার প্রকার : ১. স্ত্রীর মা (শাশুড়ি) ২. স্ত্রীর কন্যা ৩. পিতার স্ত্রী (সহোদর মা, সৎ মা) ও ৪. পুত্রবধু। (তাফসীরে কুরতুবী ২/৭৪)
উল্লেখ্য, শাশুড়ি বলতে স্ত্রীর মা, দাদী-নানী এভাবে উপরের দিকের সকলকে বোঝাবে। তবে স্ত্রীর খালা, ফুফু অর্থাৎ খালা শাশুড়ি, ফুফু-শাশুড়ি মাহরাম নয়। এঁদের সাথে পর্দা আছে। একই কথা নারীর ক্ষেত্রে। স্বামীর পিতা, দাদা ও নানার সাথে পর্দা নেই। তবে স্বামীর চাচা, মামা অর্থাৎ চাচা-শ্বশুর, মামা-শ্বশুরের সাথে পর্দা আছে।
উপরের আলোচনা থেকে পর্দার বিধান পালন সম্পর্কে আমরা যা পেয়েছি তা হচ্ছে-
এক. পর্দার বিধান পালন করার অর্থ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশ পালন করা, যা মুমিনের জন্য অপরিহার্য। আল্লাহ তাআলার ইরশাদ-
وما كان لمؤمن ولا مؤمنة اذا قضى الله ورسوله امرا ان يكون لهم الخيرة من امرهم ومن يعص الله ورسوله فقد ضل ضلالا بعيدا.
(তরজমা) আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো বিষয়ে নির্দেশ দিলে কোনো মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্তের অবকাশ থাকবে না। কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করলে সে স্পষ্টতই পথভ্রষ্ট হবে। (সূরা আহযাব (৩৩) : ৩৬)
দুই. পর্দার বিধান মেনে চলা হচ্ছে ঈমানের দাবি। কেননা আল্লাহ তাআলা পর্দা-বিধানের ক্ষেত্রে শুধু ঈমানদার নারীপুরুষকেই সম্বোধন করেছেন।
তামীম গোত্রের কয়েকজন নারী উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা.-এর নিকট আগমন করল, যাদের পরনে ছিল পাতলা কাপড়। উম্মুল মুমিনীন তাদেরকে উদ্দেশ করে বললেন, তোমরা যদি মুমিন নারী হও তাহলে এ তো মুমিন নারীর পোশাক নয়। আর যদি মুমিন না হও তাহলে তা ব্যবহার করতে পার।(মাআলিমুস সুনান ৪/৩৭৬)
এক নববধুকে উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা.-এর নিকট আনা হল, যার পরনে ছিল রঙ্গিন কিবতী চাদর। তখন উম্মুল মুমিনীন রা. বললেন, যে নারী এ রকম পোশাক পরিধান করে তার তো সূরা নূরের প্রতি ঈমান নেই। (তাফসীরে কুরতুবী ১৪/২৪৪)
তিন. পর্দাপালন হল সতর।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-নিশ্চয়ই আল্লাহ অধিক লাজুক ও পর্দাশীল। তিনি লজ্জা ও পর্দাকে পছন্দ করেন। (আবু দাউদ, হাদীস : ৪০১২, ৪০১৩; সুনানে নাসাঈ ১/২০০; মুসনাদে আহমদ ৪/২২৪
আল্লাহ তাআলা পিতা আদম ও হওয়া আ.-এর প্রতি পর্দার নেয়ামতকে বর্ণনা করে ইরশাদ করেছেন-
ان لك الا تجوع فيها ولاتعرى
(তরজমা) তোমার জন্য এ-ই রইল যে, তুমি জান্নাতে ক্ষুধার্তও হবে না এবং নগ্নও হবে না।-সূরা ত্বহা (২০) : ১১৮)
অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বান্দার প্রতি তাঁর অনুগ্রহ বর্ণনা করে ইরশাদ করেছেন-
يبنى ءادم قد انزلنا عليكم لباسا يورى سوءتكم وريشا ولباس التقوى ذلك خير.
(তরজমা) হে বনী আদম! তোমাদের লজ্জাস্থান ঢাকার ও বেশ-ভূষার জন্য আমি তোমাদেরকে পরিচ্ছদ দিয়েছি এবং তাকওয়ার পরিচ্ছদ এটাই সর্বোৎকৃষ্ট।- সূরা আরাফ (৭) : ২৬)
চার. পর্দা হল নারী-পুরুষ উভয়ের হৃদয়ের পবিত্রতার উপায়। স্বয়ং আল্লাহ তাআলা তা ঘোষণা করেছেন।
পাঁচ. পর্দা হল ইফফাত তথা চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষার উপায়। এই ইফফত ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দুআর অংশ। তিনি দুআ করতেন-
أسألك الهدى والتقى والعفة
অন্য রেওয়ায়েতে
إني أسألك الهدى والتقى والعفاف
অর্থ : (হে আল্লাহ!) আমি আপনার নিকট প্রার্থনা করছি হেদায়েত, তাকওয়া ও ইফফত (চারিত্রিক পবিত্রতা)।-সহীহ মুসলিম (কিতাবুয যিকর; জামে তিরমিযী (দাওয়াত অধ্যায়); ইবনে মাজাহ (দুআ অধ্যায়); মুসনাদে আহমদ ১/৪১১, ৪১৬ ও ৪৩৬
এই পবিত্রতা হচ্ছে জান্নাতী নারীদের একটি গুণ। আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন আয়াতে এর দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
আল্লাহ তাআলা তাদের অসাধারণ রূপের বর্ণনা দেওয়ার সাথে সাথে একথাও বলেছেন যে, তারা নির্ধারিত গৃহে অবস্থান করবে এবং নিজ স্বামী ছাড়া অন্যের দিকে দৃষ্টিপাত করবে না। তো তাদের সৌন্দর্যের পাশপাশি তাদের পবিত্রতারও প্রশংসা করেছেন। সুতরাং রূপ-সৌন্দর্যের সাথে যদি ইফফাত ও সতীত্ব থাকে তবে এরচেয়ে উত্তম আর কী হতে পারে?!! আর পর্দাই হল সতীত্ব রক্ষার উপায়।



মুসলমানের  পোশাক : কিছু মূলনীতি
মাওলানা আনসারুল্লাহ হাসান
পোশাক-পরিচ্ছদ মানব জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, পোশাক যেমন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ঢেকে রাখা ও সৌন্দর্যের উপকরণ, তেমনি শরীয়তের দিক-নির্দেশনা মেনে তা ব্যবহার আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম, কুরআন-হাদীসে অন্যান্য বিষয়াদির মতো লেবাস-পোশাক বিষয়েও হুকুম-আহকাম দেওয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পোশাক সম্পর্কিত দ্বীনী হেদায়াত ও শরীয়তের বিধি-বিধান বর্ণনা করেছেন এবং এ বিষয়ে সাহাবায়ে কেরামের তরবিয়ত করেছেন। আর
সাহাবায়ে কেরামও নিজ নিজ ঘরে গিয়ে আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশ মতো স্ত্রী-কন্যা ও সন্তান-সন্ততির তরবিয়ত করেছেন। কারণ পোশাক-পরিচ্ছদের ভালো মন্দ মানুষের কাজ-কর্ম, আচার-আচরণ, চরিত্র ও নৈতিকতা তথা মানবিক জীবনের উপর বিরাট প্রভাব বিস্তার করে এবং অন্তর ও মন-মানসিকতায় গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তাই পোশাকের বিষয়টি এ রকম সাধারণ কোনো বিষয় নয় যে, একটি কাপড় কিনলাম এবং তা পরে নিলাম। বরং এক্ষেত্রে শরীয়তের দিক-নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি।
পোশাক যে অনেক বড় নেয়ামত তা বর্ণনা করে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
يبنى ءادم قد انزلنا عليكم لباسا يورى سوءتكم وريشا ولباس التقوى ذلك خير.
হে আদমের সন্তান! আমি তোমাদের জন্য পোশাকের ব্যবস্থা করেছি, তোমাদের দেহের যে অংশ প্রকাশ করা দূষণীয় তা ঢাকার জন্য এবং তা সৌন্দর্যেরও উপকরণ। বস্ত্তত তাকওয়ার যে পোশাক সেটাই উত্তম। এসব আল্লাহর নিদর্শনাবলির অন্যতম। এর উদ্দেশ্য মানুষ যাতে উপদেশ গ্রহণ করে।
পোশাকের কিছু মৌলিক নীতিমালা
পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যাপারে ইসলামী শরীয়তের বিধান অত্যন্ত যৌক্তিক ও উপকারী। শরীয়ত বিশেষ কোনো পোশাক সুনির্দিষ্ট করে দেয়নি এবং কোনো নির্দিষ্ট ডিজাইন বা আকৃতিও বলে দেয়নি যে, এ ধরনের পোশাকই তোমাদের পরতে হবে; বরং বিভিন্ন দেশ, অঞ্চল, আবহাওয়া ও মৌসুম ভেদে পোশাক পরিধানের স্বাধীনতা দিয়েছে। তবে কিছু মৌলিক নীতি ও সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছে যে, এ ধরনের পোশাক গ্রহণীয় ও এ ধরনের পোশাক বর্জনীয়। সুতরাং মুসলিম নারী-পুরুষের জন্য পোশাক-পরিচ্ছদের ক্ষেত্রে এসব নীতিমালা ও সীমারেখা মেনে চলা জরুরি। যে পোশাক এই নীতিমালা ও সীমারেখা অনুযায়ী হবে সেটাই শরীয়তসম্মত পোশাক বলে গণ্য হবে।
এক. পোশাক এমন আঁটসাঁট ও ছোট মাপের হতে পারবে না, যা পরলে শরীরের সাথে লেপ্টে থাকে এবং দৈহিক গঠন ও বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ফুটে ওঠে।
আবু ইয়াযীদ মুযানী রাহ. বলেন, হযরত ওমর রা. মহিলাদেরকে কাবাতী (মিসরে প্রস্ত্ততকৃত এক ধরনের সাদা কাপড়) পরতে নিষেধ করতেন। লোকেরা বলল, এই কাপড়ে তো ত্বক দেখা যায় না। তিনি বললেন, ত্বক দেখা না গেলেও দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ফুটে ওঠে।-মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ২৫২৮৮
দুই. পোশাক এমন পাতলা ও মিহি হতে পারবে না যাতে শরীর দেখা যায় এবং সতর প্রকাশ পেয়ে যায়। যেমন পাতলা সুতির কাপড়, নেটের কাপড় ইত্যাদি। অবশ্য পাতলা কাপড়ের নিচে সেমিজজাতীয় কিছু ব্যবহার করলে তা জায়েয হবে।
হযরত আলকামা ইবনে আবু আলকামা তার মা থেকে বর্ণনা করেন যে, একবার হাফসা বিনতে আবদুর রহমান তার ফুফু উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা.-এর নিকটে এল। তখন তার পরনে ছিল একটি পাতলা ওড়না। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. তা ছিঁড়ে ফেললেন এবং একটি মোটা ওড়না পরিয়ে দিলেন।-মুয়াত্তা মালেক ২/৯১৩, হাদীস : ৬
তিন. পোশাকের ক্ষেত্রে কাফের-মুশরিক ও ফাসেক লোকদের অনুসরণ-অনুকরণ ও সাদৃশ্য অবলম্বন করা যাবে না। বিশেষত সেইসব পোশাকের ক্ষেত্রে যা অমুসলিমদের বৈশিষ্ট্য এবং তাদের নিদর্শনের অন্তর্ভুক্ত।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা. বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকেউসফুর (ছোট ধরনের লাল বর্ণের ফুল গাছ) দ্বারা রাঙানো দুটি কাপড় পরতে দেখে বললেন,এগুলো হচ্ছে কাফিরদের পোশাক। অতএব তুমি তা পরিধান করো না।-সহীহ মুসলিম, হাদীস : ২০৭৭; নাসায়ী, হাদীস : ৫৩১৬
তাছাড়া অন্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-যে ব্যক্তি অন্য কোনো জাতির  সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদেরই দলভুক্ত। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৪০২৭
চার. পোশাকের মাধ্যমে অহংকার ও লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ উদ্দেশ্য হওয়া যাবে না।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-যে ব্যক্তি দুনিয়াতে সুখ্যাতি ও প্রদর্শনীর পোশাক পরবে আল্লাহ তাআলা কেয়ামতের দিন তাকে লাঞ্ছনার পোশাক পরাবেন।-মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ৬২৪৫; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৪০২৫
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- যে ব্যক্তি অহংকারবশত মাটিতে কাপড় টেনে টেনে চলে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার দিকে দৃষ্টিপাত করবেন না।-সহীহ বুখারী, হাদীস : ৫৭৮৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ২০৮৭
পাঁচ. পুরুষদের জন্য মেয়েলী পোশাক এবং নারীদের জন্য পুরুষদের পোশাক পরা এবং একে অন্যের সাদৃশ্য গ্রহণ করা নিষেধ। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই সব পুরুষের উপর লানত করেছেন, যারা নারীদের সাদৃশ্য গ্রহণ করে (তাদের মতো আকৃতি, তাদের পোশাক ও তাদের চাল-চলন গ্রহণ করে)। আর সেই সব নারীর উপরও লানত করেছেন, যারা পুরুষের সাদৃশ্য গ্রহণ করে।-সহীহ বুখারী, হাদীস : ৩৮৮৫
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নারীর পোশাক পরিধানকারী পুরুষকে এবং পুরুষের পোশাক পরিধানকারিনী নারীকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লানত করেছেন।-সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৪০৯২
ছয়. পোশাক-পরিচ্ছদের ক্ষেত্রে অপচয় ও অপব্যয় করা, বিলাসিতা করার জন্য বা শখের বশে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পোশাক ক্রয় করা অথবা মাত্রাতিরিক্ত উচ্চমূল্যের পোশাক ক্রয় করা নিষেধ।
হযরত আমর ইবনে শুআইব তার পিতা থেকে, তিনি তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা খাও, পান কর, অন্যদের দান কর এবং কাপড় পরিধান কর যে পর্যন্ত অপচয় ও অহংকার করা না হয়।-সুনানে নাসায়ী, হাদীস : ২৫৫৯; ইবনে মাজাহ,হাদীস : ৩১০৫
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. বলেন, যা মনে চায় খাও, যা মনে চায় পরিধান কর যে পর্যন্ত দুটি বিষয় না থাকে : অপচয় ও অহংকার।-সহীহ বুখারী ১০/১৫২
সাত. গায়রে মাহরাম ও পর পুরুষের সামনে অলংকার ও পোশাকের সৌন্দর্য প্রকাশ করা যাবে না, যাতে তারা সেদিকে আকৃষ্ট হয়।
ولا يبدين زينتهن الا ما ظهر منها
তারা যেন নিজেদের ভূষণ প্রকাশ না করে।
উক্ত আয়াতে নারীদেরকে হুকুম করা হয়েছে তারা যেন গায়রে মাহরাম বা পর পুরুষের সামনে নিজেদের পুরো শরীর বড় চাদর বা বোরকা দ্বারা আবৃত করে রাখে। যাতে তারা সাজ-সজ্জার অঙ্গসমূহ দেখতে না পায়।
ইমাম যাহাবী রাহ. বলেন, যে সব কর্ম নারীর উপর লানত করে তা হল অলংকার ও আকর্ষণীয় পোশাকের সৌন্দর্য প্রকাশ করা। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় সুগন্ধি ব্যবহার ...। আলকাবায়ের পৃ. ১০২
وقرن فى بيوتكن ولا تبرجن تبرج الجاهلية الاولى
নিজ গৃহে অবস্থান কর সাজ-সজ্জা প্রদর্শন করে বেড়িও না। যেমন প্রাচীন জাহেলী যুগে প্রদর্শন করা হত।
প্রাচীন জাহেলী যুগে নারীরা নির্লজ্জ সাজ-সজ্জার সাথে নিজেদের প্রদর্শন করে বেড়াত। আজকের নব্য জাহেলিয়াতের অশ্লীলতা এতটাই উগ্র যে, তার সামনে প্রাচীন জাহেলিয়াত ম্লান হয়ে গেছে।
আট. পুরুষের জন্য টাখনুর নীচে ঝুলিয়ে কাপড় নিষেধ এবং তা কবীর গুনাহ।
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, কাপড়ের যে অংশ টাখনুর নীচে যাবে তা (টাখনুর নীচের অংশ) জাহান্নামে জ্বলবে।-সহীহ বুখারী, হাদীস : ৫৭৮৭
হযরত আবু হুবাইব ইবনে মুগাফফাল গিফারী রা. মুহাম্মাদ কুরাশীকে লুঙ্গি টেনে চলতে দেখে তার দিকে তাকিয়ে বললেন-আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে অহংকারবশত পায়ের নীচে কাপড় ফেলে চলবে সে জাহান্নামে গিয়ে এভাবে চলবে।-মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ১৫৫৪২
 আল্লাহ তাআলা মহিলাদেরকে সম্বোধন করে বলেছেন, তোমরা নিজগৃহে অবস্থান কর। এ আয়াতে একটি মূলনীতি বলে দেওয়া হয়েছে যে, নারীর আসল জায়গা ও কর্মস্থল তার ঘর। গৃহকর্ম ও খান্দান গড়ে তোলাই তার দায়িত্ব। যে সব তৎপরতা এ দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন ঘটায় তা নারীজীবনের মৌলিক উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। এর অর্থ এমন নয় যে, ঘর হতে বের হওয়া তার জন্য একদম জায়েয নয়। অতি প্রয়োজনে ঘর হতে বের হওয়া জায়েয। তবে কিছু আদাব ও নিয়মাবলি মেনে চলতে হবে।
১. পুরো শরীর বড় এবং মোটা চাদর দ্বারা অথবা সমগ্র শরীর ঢাকা যায় এমন বোরকা দ্বারা আবৃত করে ফেলবে। মাথা থেকে পা পর্যন্ত শরীরের কোনো অংশ খোলা রাখা যাবে না। চেহারা, উভয় হাত কব্জিসহ এবং উভয় পা টাখনুসহ আবৃত করবে। পথ-ঘাট দেখার জন্য শুধু চোখ খোলা রাখা যাবে। প্রয়োজনে হাত ও পায়ের মোজা এবং চেহারার জন্য আলাদা নেকাব ব্যবহার করবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন। হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদের, আপনার কন্যাদের এবং মুমিনদের নারীদেরকে বলে দিন, তারা যেন নিজেদের মুখের উপর তাদের চাদর নামিয়ে দেয়।-সূরা আহযাব : ৫৯
অন্য আয়াতে মুমিন নারীদেরকে সম্বোধন করে বলেছেন-তোমরা সাজসজ্জা প্রদর্শন করে বেড়িও না যেমন প্রাচীন জাহেলী যুগে প্রদর্শন করা হত। -সূরা আহযাব : ৩৩
মনে রাখতে হবে, টাখনু পর্যন্ত কদম, কব্জি পর্যন্ত হাতের পাতা এবং চেহারা সতরের অন্তর্ভুক্ত নয়, ফলে তা নামাযের সময় খোলা রাখা যাবে। কিন্তু এসব অঙ্গ পর্দার হুকুমের অন্তর্ভুক্ত। ফলে গায়রে মাহরাম ও পরপুরষের সামনে তা খোলা রাখা যাবে না।
২. ঘরের বাইরে যাওয়ার সময়  মেক-আপ, সাজসজ্জা গ্রহণ করবে না এবং কোনো ধরনের সুগন্ধি ব্যবহার করবে না। হযরত আবু মুসা আশআরী রা. হতে বর্ণিত এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যখন কোনো মহিলা সুগন্ধি মেখে ঘর থেকে বের হয় এবং লোকদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে যাতে তারা তার খুশবু গ্রহণ করে, তবে
সে ব্যভিচারিণী।-মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ১৯৩৬; জামে তিরমিযী, হাদীস : ২৭৮৭; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৪১৭৪-৭৫
৩. স্বামী বা অভিভাবকের অনুমতি গ্রহণ করবে।
হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, যে নারী স্বামীর ঘর হতে স্বামীর অনুমতি ব্যতীত বের হয়ে যায় সে ঘরে ফিরে আসা পর্যন্ত অথবা স্বামী সন্তুষ্ট হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা তার উপর অসন্তুষ্ট থাকেন।-কানযুল উম্মাল
৪. দূরের সফর হলে একা যাবে না; বরং কোনো মাহরাম পুরুষের সাথে যাবে।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভাষণে বলতে শুনেছি, কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে মাহরাম ব্যক্তি ছাড়া নির্জনে অবস্থান করবে না। এবং কোনো নারী মাহরাম ছাড়া সফর করবে না।-সহীহ বুখারী, হাদীস : ৩০২৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১৩৪১
৫. এমনভাবে চলবে না যে, অলংকারের শব্দ মাহরাম নয় এমন কেউ শুনতে পায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন-মুসলিম নারীদের উচিত, মাটিতে এমনভাবে পা না ফেলা, যাতে তাদের গুপ্ত সাজ-সজ্জা জানা হয়ে যায়।-সূরা নূর : ৩১
৬. গায়রে মাহরাম তথা বেগানা পুরুষের দিকে দৃষ্টিপাত করবে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন, হে নবী! মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে। ... -সূরা নূর : ৩১
হযরত জারীর ইবনে আবদুল্লাহ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হঠাৎ দৃষ্টি পড়ে গেলে করণীয় কী-জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তিনি আমাকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে আদেশ করলেন।-সহীহ  মুসলিম, হাদীস : ২১৫৯
৭. মাহরাম নয় এমন পুরুষের সাথে অতি প্রয়োজন ছাড়া কথা বলবে না। একান্ত যদি বলতেই হয় তবে নরম ও কোমল ভাষায় বলবে না, যাতে তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে না পড়ে। আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমরা কোমল কণ্ঠে কথা বলো না। পাছে অন্তরে ব্যাধি আছে এমন ব্যক্তি লালায়িত হয়ে পড়ে। আর তোমরা বলো সঙ্গত কথা।-সূরা আহযাব : ৩২

ইসলামের পর্দা-বিধান ও আমাদের অসতর্কতা
শামীমা বিনতে নূর
ইসলাম আল্লাহ পাকের মনোনীত দ্বীন। জীবনের এমন কোনো অঙ্গন নেই, যেখানে ইসলামের বিধান ও শিক্ষা নেই। সেই শিক্ষা ও বিধান যখন আমরা ভুলে যাই তখনই আমাদের উপর বিপর্যয় নেমে আসে। আখেরাতের ভয়াবহ শাস্তি তো আছেই, দুনিয়ার জীবনও বিপর্যস্ত হয়ে যায়।
সম্প্রতি নারীনির্যাতন খুব বেড়ে গেছে, বিশেষত উঠতি বয়েসী মেয়েরা চরম নিরাপত্তাহীনতার শিকার। এটা এ সমাজের চরম ব্যর্থতা যে, নিজেদের মা-বোনকেও নিরাপত্তা দিতে পারছে না। এ অবস্থায় মা-বোনদেরকে গভীরভাবে ভাবতে হবে নিজেদের নিরাপত্তা সম্পর্কে। অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন প্রয়োজন অনেক বেশি সতর্কতা ও সচেতনতার। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক সত্য এই যে, বিপর্যয়ের সাথে পাল্লা দিয়েই যেন বেড়ে চলেছে আমাদের অবহেলা ও অসচেতনতা। বর্তমান নিবন্ধে চলমান সমাজচিত্রের কিছু অংশ ও আমাদের অবহেলার কিছু দিক পাঠকের সামনে তুলে ধরতে চাই।
এক.
আমার প্রতিবেশী একজন শিক্ষক। তাঁর কাছে পড়তে আসে অনেক ছেলেমেয়ে। ছোট ছোট মেয়েরা যেমন আসে তেমনি আসে উঠতি বয়সের কিশোরীরাও। ওদের অনেকেরই পোশাক এমন যে, আমি বিষণ্ণ বোধ করি। আমি ভাবি ওদের মায়েদের কথা। তাঁরা কীভাবে তাদের মেয়েদেরকে পুরুষ শিক্ষকের কাছে পাঠান, উপরন্তু এমন পোশাকে? তাঁদের যদি আখেরাতের ভয় না থাকে, দুর্ঘটনার ভয়ও কি নেই? এই তো কদিন আগে ভিকারুন্নিসা নুন স্কুলের ঘটনাটি নিয়ে পত্রপত্রিকায় তোলপাড় হল। এর আগেও এরকম ঘটনা পত্রিকার পাতায় এসেছে। অনেক পিতামাতাই হয়তো উদ্বিগ্ন, কিন্তু সম্ভবত তারা ভাবছেন, এছাড়া তাদের কোনো উপায় নেই। তাই সর্বোচ্চ ঝুঁকির মুখেও মেয়েদেরকে এই শিক্ষাটাই দিচ্ছেন এবং এই পদ্ধতিতেই দিচ্ছেন। কিন্তু সত্যিই কি উপায় নেই? সত্যিই কি এর কোনো বিকল্প নেই? সেই উপায় ও বিকল্প খুঁজে বের করাই এখন সময়ের দাবি।
দুই.
আল্লাহ পাক কুরআন শরীফে বলেছেন-(তরজমা) ঈমানদাররা! ইসলামে প্রবেশ কর পরিপূর্ণভাবে আর অনুসরণ করো না শয়তানের পদাঙ্ক; নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন।
কোরআন শরীফের এই আয়াতটি মনে পড়েছে আমার একজন আত্মীয়াকে দেখে। নিজের মহলে তিনি যথেষ্ট দ্বীনদার। নামায-রোযা ও দান-খয়রাতে তাঁর সুনাম আছে। এলাকার অনেক মেয়েকে তিনি বোরকা দিয়েছেন এবং তারা পর্দা মেনে চলতে শুরু করেছে। নিজের মেয়েদেরকেও বোরকায় অভ্যস্ত করেছেন, তবে অনেক ইংরেজি শিক্ষিত দ্বীনদারের মতো তাদের পড়িয়েছেন কলেজ-ভার্সিটিতে। তিনি হয়তো চিন্তাও করেননি যে, মেয়ের কারণে তার নিজের দ্বীনদারীও আক্রান্ত হতে পারে।
সহশিক্ষার উন্মুক্ত পরিবেশে অনেক ক্ষেত্রেই যা হয় তার সন্তানের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। একটি দ্বীনহীন পরিবারের ছেলের সাথে মেয়েটির সম্পর্ক হয়েছে। তাদের বিয়ের অনুষ্ঠানের অবস্থা যা শুনেছি তা এখানে উল্লেখ করা সম্ভব নয়। শুধু এটুকু বলি, ঐ অনুষ্ঠানেই তাঁকে শুনতে হয়েছে পর্দা ও বোরকা সম্পর্কে বেয়াই-বেয়াইনের অনেক বিদ্রুপাত্মক কথাবার্তা।
এখানে সম্ভবত পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করার একটি দিক স্পষ্ট হয়েছে। আমি নামায পড়ি, রোযা রাখি, কিন্তু জাহেলিয়াতের মোহ ত্যাগ করতে পারি না, সন্তান-সন্ততিকে বানাতে চাইপ্রগতিশীল মুসলিম তাহলে আমি পরিপূর্ণভাবে ইসলামে ঢুকিনি। আমি পূর্ণাঙ্গ মুসলিম তখনই হতে পারব যখন বিশ্বাস করব ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ দ্বীন বলে এবং শিক্ষা-দীক্ষায়, রুচি ও জীবনাচারে ইসলাম যা দিয়েছে তাকেই গ্রহণ করতে পারব সর্বোত্তম বলে।
আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো বলেছেন, ঈমানের লযযত ঐ ব্যক্তি পেয়েছে, যে আল্লাহকে রব হিসেবে পেয়ে ইসলামকে দ্বীন হিসেবে পেয়ে এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে রাসূল হিসেবে পেয়ে সন্তুষ্ট হয়ে গেছে।
তিন.
গায়রে মাহরাম পুরুষের সাথে নারীর পর্দা আছে। সাধারণত গায়রে মাহরামের অর্থ করা হয় বেগানা বা পরপুরুষ। এই তরজমা সূক্ষ্ম ও সঠিক নয়। কারণ অনেক আত্মীয়ও এমন আছে যারা গায়রে মাহরাম, অর্থাৎ তাদের সাথে পর্দা করা জরুরি। অনেকে অনাত্মীয়দের সাথে পর্দা করলেও গায়রে মাহরাম আত্মীয়দের সাথে পর্দা করেন না। অথচ কোনো কোনো ক্ষেত্রে আত্মীয়দের মাধ্যমেই দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেশি থাকে। কিছু দিন আগে ভাসুরের হাতে ভ্রাতৃবধুর অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যুর সংবাদ খবরের কাগজে প্রকাশিত হয়েছিল। আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো অনেক আগেই বলে গেছেন-আলহামভু আলমাওত। অর্থাৎ স্বামী পক্ষীয় আত্মীয় তো মৃত্যু। এ কথাটি তিনি বলেছিলেন গায়রে মাহরাম আত্মীয়ের সাথে পর্দার অপরিহার্যতা বর্ণনা করে।
ভাসুর, দেবর, চাচা শশুর, মামা শশুর, ভাসুরের ছেলে, দেবরের ছেলে, ননদের ছেলে, স্বামীর খালু-ফুফা, খালাতো, মামাতো, চাচাতো, ফুফাতো ভাই, এদের সবার সাথে পর্দা আছে। তেমনি নিজের খালু, ফুফা, খালাতো-ফুফাতো ভাই এবং মামাতো-চাচাতো ভাইয়ের সাথেও পর্দা আছে। একজন পর্দানশীন নারীকে এ বিষয়ে সচেতন হওয়া এবং দৃঢ়তার পরিচয় দেওয়া অপরিহার্য।
স্বামীর কর্তব্য, এ বিষয়ে স্ত্রীকে সহযোগিতা করা। কারণ স্ত্রী অজ্ঞ বা অসচেতন হলে তাকে সচেতন করা এবং পর্দায় অভ্যস্থ করা ছিল স্বামীর কর্তব্য; তো স্ত্রী যখন স্বেচ্ছায় পর্দা করতে আগ্রহী তখন তো একে আল্লাহর মহা নেয়ামত মনে করা উচিত। বস্ত্তত এমন স্ত্রীই হচ্ছেন নবীজীর আলমারআতুস সালিহা বা নেককার রমণী, যাকে তিনি খাইরু মাতায়িদ দুনিয়া বা জগতের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ বলে অভিহিত করেছেন।
দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, মাহরাম পুরুষের মাঝেও স্তরভেদ আছে। সকল মাহরাম এক পর্যায়ের নয়। উপরন্তু কোনো মাহরাম যদি ফাসিক হয় কিংবা তার আচার-আচরণ মার্জিত ও শোভন না হয় তখন তো অনেক বেশি সতর্কতার প্রয়োজন। আল্লাহ পাক মানুষের সৃষ্টিকর্তা, তিনি শরীয়ত দান করেছেন। মানুষ যা জানে না তিনি তা জানেন, মানুষ যা বোঝে না তিনি তা বোঝেন। নামায-রোযার মতো হজ্বও একটি ফরয ইবাদত। কিন্তু শরীয়তের বিধান হল ফাসিক মাহরামের সাথে নারী হজ্বে যেতে পারবে না। সুতরাং মাহরাম হলেই আর কোনো সতর্কতার প্রয়োজন নেই এমন নয়। এখন তো অনেক পরিবারে-আল্লাহ হেফাযত করুন-শশুরের মাধ্যমেও পুত্রবধুদের নির্যাতিত হওয়ার কথা শোনা যায়। তেমনি কিছুদিন আগে পত্রিকায় এসেছিল শাশুড়ি-জামাই বিয়ে এবং এ নিয়ে সালিশ-দরবারের একটি সংবাদ। এসব কথা লিখতে খারাপ লাগছে, কিন্তু এগুলোই এখন বাস্তবতার অংশ। সুতরাং সচেতন না হয়ে উপায় নেই।
চার.
পর্দানশীন নারীকেও কখনো কখনো পুরুষ চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়। চিকিৎসকরা হচ্ছেন আমাদের সমাজের অভিজাত শ্রেণী। তাদের মধ্যে যেমন বিনয়ী ও চরিত্রবান ব্যক্তি আছেন, তেমনি কিছু ব্যতিক্রমও আছে, যার দৃষ্টান্ত মাঝে মাঝে পত্রিকার পাতায় দেখা যায়।
আমরা মুসলিম পর্দানশীন নারী। প্রথমেই আমরা খুঁজব একজন নারী চিকিৎসক। পুরোপুরি পর্দানশীন চিকিৎসক পাওয়া তো মুশকিল, তবে পর্দানশীন নারীদের শ্রদ্ধা করেন, অন্তত ভদ্রতা ও সৌজন্য রক্ষা করেন এমন নারী চিকিৎসক এখনও আছেন। তবে কষ্ট করে তাঁদের খুঁজে নিতে হয়।
আমরা প্রথমেই কেন যাব পুরুষ চিকিৎসকের কাছে? আমার স্বামী দাঁতের চিকিৎসার জন্য একজন চিকিৎসকের কাছে গিয়েছিলেন। তিনি অবাক হয়ে দেখেছেন যে, সেখানে সিরিয়াল নিয়ে বেশ কয়েকজন বোরকাপরা নারীও বসে আছেন। অথচ দাঁতের ভালো চিকিৎসা করেন এমন নারী চিকিৎসক দুর্লভ নন।
দাঁতের চিকিৎসায় রোগীকে দীর্ঘ সময় চিকিৎসকের নিকট-সান্নিধ্যে থাকতে হয়। এসময় রোগিনীর প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক, বিশেষত তরুণী ও যুবতী রোগিনীর ক্ষেত্রে এটা আরও সত্য।
মধ্য প্রাচ্যের একটি দেশের একজন দাঁতের চিকিৎসকের কথা সেখানকার পত্র-পত্রিকায় এসেছিল, যিনি প্রায় প্রতিটি রোগিনীর সাথেই অশোভন আচরণ করেছেন। এমনকি সেই সব দৃশ্য গোপন ক্যামেরায় ধারণ করে তাদের অনেককে অবৈধ সম্পর্কেও বাধ্য করেছেন।
আমাদের দেশেও কি এ ধরনের ঘটনা ঘটছে না? তো আমরা যারা পর্দা মেনে চলি তাদের সাবধান থাকা প্রয়োজন। একান্ত অপারগ অবস্থায় যদি পুরুষ চিকিৎসকের কাছে যেতেই হয় তাহলেও মাহরাম পুরুষকে সাথে নিয়ে চিকিৎসকের সামনে যাওয়া উচিত। কোনো অবস্থাতেই একা যাওয়া উচিত নয়। হাদীস শরীফে কি বেগানা নারী-পুরুষের একান্ত সাক্ষাতকে কঠিনভাবে নিষেধ করা হয়নি?
পাঁচ.
মোবাইল ফোন এখন আমাদের অতি প্রয়োজনীয় জিনিস। একটি মোবাইল নেই এমন মানুষ এখন খুঁজে পাওয়া কঠিন। মোবাইল ফোনের কারণে আত্মীয়-স্বজনের খোঁজখবর নেওয়া ও প্রয়োজনীয় যোগাযোগ অনেক সহজ হয়েছে। এটা মোবাইলের সুফল। অন্যদিকে যোগাযোগের ক্ষেত্রে শরীয়তের বিধান মেনে না চলার কারণে মোবাইলের মাধ্যমে অনেক দুর্ঘটনাও ঘটছে। আমাদের জানাশোনার মধ্যে ঘটে যাওয়া একটা ঘটনার সারসংক্ষেপ হল, এক ভদ্র পরিবারের পুত্রবধু, যার স্বামী মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে কর্মরত। স্বামীর সাথে কথা বলার জন্য তার কাছে একটি ফোন ছিল। সেই ফোনেই মিসডকলের মাধ্যমে এক ব্যক্তির সাথে তার পরিচয় হল। একপর্যায়ে স্বামীর সংসার ও নিজের তিনটি সন্তান রেখে মহিলাটি উধাও হয়ে গেল। এমন ঘটনা তো নতুন নয় তবে  পরিবারটি যেহেতু ভদ্র ও মোটামুটি ধার্মিক হিসেবে পরিচিত ছিল তাই গ্রামে তোলপাড় শুরু হল এবং পঞ্চায়েত বৈঠকে সিদ্ধান্ত হল যে, এই গ্রামের কোনো নারীর কাছে মোবাইল ফোন থাকতে পারবে না। যদি কারো কাছে মোবাইল ফোন পাওয়া যায় তাহলে তাকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।
মোবাইল ফোন ব্যবহার করার বিষয়ে আমরা কিছু সতর্কতা রক্ষা করতে পারি। পরিচিত আত্মীয়-স্বজনের নাম্বার সংরক্ষণ করে রাখতে পারি এবং অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন এলে স্বামী বা অন্য কারো মাধ্যমে রিসিভ করাতে পারি। মহিলার কণ্ঠ শুনলেই অনেকে অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা শুরু করে দেয় সেগুলোর জবাব না দিয়ে চুপচাপ মোবাইল বন্ধ করে দেওয়া উচিত। আর প্রয়োজনে গায়রে মাহরাম পুরুষের সাথে কথা বলতে হলে কুরআনের বিধান অনুযায়ী অনাকর্ষণীয় কণ্ঠে কথা বলা উচিত।
ছয়.
আমাদের দেশের মানুষ সাধারণত পীরভক্ত। ভক্তি-শ্রদ্ধা যদি সঠিক মাত্রায় হয় এবং সঠিক পাত্রে হয় তাহলে দোষের কিছু নেই। হক্কানী পীর-মাশায়েখ মানুষকে তাকওয়া-পরহেযগারী শিক্ষা দেন এবং আত্মশুদ্ধির দীক্ষা দেন, সর্বোপরি তাঁরা মানুষকে কুরআন-সুন্নাহর পথে পরিচালিত করেন। তাই আল্লাহওয়ালা বুযুর্গের সাথে ইসলাহ ও সংশোধনের সম্পর্ক রাখা ফায়েদাজনক। তবে চকচকে সবকিছুই যেমন সোনা নয় তেমনি পীর নামধারী ব্যক্তিমাত্রই আল্লাহওয়ালা নয়। সবকিছুর মতো এখানেও ভেজাল আছে। কিছু প্রতারক আছে, যারা নিজেদেরকে পীর নামে পরিচয় দেয় এবং নারী-পুরুষের সকল সমস্যার সমাধানের গ্যারান্টি দেয়। বলাবাহুল্য, এরা পীর নয়। এদের একটি বড় পরিচয় এরা পর্দা করে না। সকল বয়েসের নারী অবাধে এদের কাছে যায় আর ওরাও নানারকম তেলেসমাতি দেখিয়ে মেয়েদেরকে ফাঁদে ফেলে। বন্ধ্যাত্ব থেকে শুরু করে কত শত রোগের যে তারা সমাধান দেয় তার ইয়ত্তা নেই!
এই পর্দাহীনতার সপক্ষে তারা নানা রকম ব্যাখ্যাও দিয়ে থাকে। যেমন কেউ বলে, পীর হচ্ছে রূহানী পিতা, সুতরাং তার সাথে পর্দা কেন? কেউ বলে, ভিতরের পর্দাই বড় পর্দা, বাইরের পর্দার প্রয়োজন কী? কিন্তু মনে রাখতে হবে, সকল পীরের বড় পীর কোরআন মজীদ; সকল মুরশিদের বড় মুরশিদ নবীর সুন্নাহ। সুতরাং কোরআন-সুন্নাহর বিপরীতে কোনো পীরের পীরালি গ্রহণযোগ্য নয়।
তো যারা নিজেদের দ্বীন ও ঈমান রক্ষায় আগ্রহী তাদেরকে এ সকল ভন্ড প্রতারকদের কাছ থেকে অবশ্যই দূরে থাকতে হবে। পর্দা হচ্ছে কুরআনের অকাট্য বিধান। এই বিধান লঙ্ঘনকারী-সে যে পরিচয়ই ধারণ করুক-কোনোভাবেই আল্লাহর খাস বান্দা হতে পারে না।
শেষকথা
এই সংক্ষিপ্ত নিবন্ধে অসতর্কতার কিছু ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা করা হল। চিন্তা করলে দেখা যাবে, এ ধরনের আরো অনেক ক্ষেত্র আছে যেখানে পর্দার বিষয়ে অসর্তকতা প্রদর্শন করা হয়। আমাদের কর্তব্য, ঐ সকল ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া এবং পুরোপুরিভাবে পর্দা মেনে চলার চেষ্টা করা। একমাত্র আল্লাহর বিধানেই রয়েছে আমাদের শান্তি ও নিরাপত্তা। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হেফাযত করুন এবং তাওফীক দান করুন। আমীন।

ফ্রান্সে বোরকায় জরিমানা এবং ...
শরীফ মুহাম্মদ
বোরকা বা নেকাব পরা মুসলমান নারীর অধিকার। ধর্মীয় দৃষ্টিতে এটি তাদের জন্য অবশ্য-পালনীয়ও বটে। কিন্তু ফ্রান্সসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে বোরকা পরার বিরুদ্ধে আইন করা হয়েছে। আইন থাকলেও অন্য দেশগুলোতে এ আইনটি কার্যকর করা বা এর জন্য ধর-পাকড় করার কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। ব্যতিক্রম ফ্রান্স। সেখানে গত এপ্রিল মাসের ১১ তারিখ থেকে এ আইনটি জোরালোভাবে কার্যকর করা হচ্ছে। ওই আইন অনুযায়ী বোরকা পরা কোনো মহিলা যদি তার মুখমন্ডল দেখাতে না চান, তবে পুলিশ তাকে সর্বোচ্চ ১৫০ ইউরো বা ২১৬ ডলার জরিমানা করতে পারে। ফ্রান্সের এ আইনটির আগ্রাসী আরেকটি রূপ হল, এতে ফরাসী বা বিদেশী যে কোনো বোরকা পরা মহিলাকে চ্যালেঞ্জ করা যাবে-যদি তিনি রাস্তা, পার্ক বা শপিংমলের মতো প্রকাশ্যস্থানে বোরকা পরে বের হন।
তবে এএফপি ও বিবিসির সূত্রে ১২ এপ্রিল ঢাকার পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত খবরে দেখা গেছে, বোরকা বিরোধী আইন কার্যকর করার প্রথম দিনেই সচেতনভাবে মুসলিম নারীরা এ আইনটি ভাঙতে শুরু করেছেন। ফ্রান্সের আভিগনন শহর থেকে প্যারিসগামী ট্রেনে উঠার আগে সাংবাদিকদের জিজ্ঞাসার জবাবে আইন ভেঙ্গে বোরকা পরা নারী কানিজা দিদার (৩২) বলেন, ফরাসী এ আইন তার ইউরোপীয় অধিকার লঙ্ঘন করেছে। আইনভাঙ্গার কারণে তাকে জরিমানার অর্থ গুণতে হয়েছে। তাকে নিয়ে ওই দিন ফরাসী মিডিয়াতে যথেষ্ট হৈ চৈ হয়েছে। কিন্তু এতে তিনি মোটেও দমে যাননি। জরিমানা দিয়ে হলেও এ উল্টো আইন ভেঙ্গে বোরকা পরে চলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। এদিকে বোরকা পরার অপরাধে আইন অনুযায়ী মুসলিম নারীদের ওপর যে জরিমানা চাপানো হবে সে জরিমানার অর্থ যোগান দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন এক ফরাসী মুসলিম ব্যবসায়ী। তিনি ফ্রান্সে বোরকা পরা নারীদের সহযোগিতার জন্য তার ২০ লাখ ইউরো মূল্যের সম্পত্তি নিলামে তোলার প্রস্ত্ততি নিয়েছেন। তিনি চান, বোরকা পরায় অভ্যস্ত ও আগ্রহী মুসলিম নারী যেন আইনের কারণে বোরকা না খুলেন। আইন ভাঙ্গার কারণে জরিমানা যা গুনতে হবে সেটা তিনি দেবেন। ধারণা করা হচ্ছে, তার মতো আরো বহু মুসলিম ব্যবসায়ী ফরাসী মুসলিম নারীদের সাহায্যে দাঁড়িয়ে যাবেন।
বোরকা বিরোধী এ আইনটির বিরুদ্ধে মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর প্রতিবাদ-বিক্ষোভের পরিকল্পনার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ইসলামী মানবাধিকার কমিশন বলেছে, এ আইন জারি ও কার্যকর করার ফলে দেশটিতে রাষ্ট্রীয় মদদে ইসলাম-আতঙ্ক ও মুসলিম বিরোধী বর্ণবাদের সূচনা হবে। কমিশনের সভাপতি বলেছেন, ২০০৪ সালে ফ্রান্সের স্কুলগুলোতে উড়না বা স্কার্ফ নিষিদ্ধ হওয়ার পর থেকে দেশটিতে অনেক মুসলিম মেয়ে পড়াশোনা ও চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। দেশটিতে মুসলমানদের ওপর হামলা বাড়তে থাকায় তাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীতা বাড়ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় ৬০ লাখ মুসলমানের বসবাসক্ষেত্র ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি এ ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন স্থানীয় ভোটারদের মন জয় করতে। এদিকে বোরকা বিরোধী আইনের এ দেশটি উপরে উপরে সভ্যতা ও মানবাধিকারের ডংকা বাজালেও দেখা যাচ্ছে, দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রকাশ্য নারী কেলেঙ্কারি ও নারী নির্যাতনের নানা ঘটনায় তোলপাড় চলছে দুনিয়াজুড়ে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট সারকোজি তার স্ত্রীকে ডিভোর্স দিয়ে কয়েক বছর যাবত বিয়ে না করেই ঘর-সংসার করছেন সাবেক এক মডেলের সঙ্গে। তাকে ফার্স্ট লেডির মর্যাদা দিয়ে সঙ্গে নিয়ে দেশ-বিদেশে সফরও করছেন তিনি। অপর দিকে আগামী নির্বাচনে তার সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী সদ্যবিদায়ী আইএমএফ প্রধান সম্প্রতি জোরপূর্বক এক হোটেল-সেবিকার ওপর চড়াও হওয়ায় গ্রেফতার হয়ে আমেরিকায় বন্দি জীবন যাপন করছেন। তার সামনে এখন দীর্ঘ কারাবাসের হাতছানি।
এখানে দেখা যাচ্ছে, যে দেশটিতে আইন করে বোরকা নিষেধ করা হয়, বোরকা পরলে জরিমানা দিতে হয়, সর্বোচ্চ স্তরে প্রকাশ্য লাম্পট্য আর ঘৃণ্য যৌন নির্যাতনের কালোদাগ সে দেশের বৈশিষ্ট্য হয়ে গেছে। অপরদিকে আইন করে, জরিমানা ধার্য করেও মুসলিম নারীদেরকে বোরকাবিহীন জীবনে বাধ্য করা সম্ভব হচ্ছে না। নিজেদের শালীনতা ও ইসলামসম্মত পোশাকরীতি বজায় রাখতে তারা যে কোনো মূল্যেই প্রস্ত্তত। এমনকি তাদের এই নৈতিক কাজে সহযোগিতার জন্য ক্ষতি স্বীকার করেও আর্থিক যোগান দিতে আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মুসলিম ভাইয়েরা পিছপা হচ্ছেন না। আল্লাহর দ্বীনের প্রতি অবজ্ঞার ফল ও আল্লাহর দ্বীনের প্রতি ভালবাসার ধারা যুগে যুগে এ রকমই হয়ে থাকে।

পথিক! তুমি পথ হারিয়েছ!
উম্মে হানী বিনতে আহমদ
বান্দার প্রতি আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ অসীম। বান্দাকে তিনি দান করেছেন অসংখ্য নেয়ামত। তাঁর বড় নেয়ামতসমূহের একটি পোশাক, যার কথা আল্লাহ তাআলা কুরআন মজীদে বলেছেন। পোশাক হচ্ছে নর-নারীর অঙ্গের ভূষণ এবং লজ্জার আবরণ। আল্লাহ রাববুল আলামীনের নিকট বান্দার পোশাক-শোভিত রূপটিই পছন্দনীয়। তাই বিশেষভাবে ইবাদতের সময় তিনি বান্দাকে আদেশ করেছেন যেন সে পোশাক-সৌন্দর্য গ্রহণ করে।  পক্ষান্তরে শয়তানের কাছে পছন্দনীয় হচ্ছে মানুষের নগ্ন ও বিকৃত রূপ। আর তা হবেই না কেন, সে তো আদম সন্তানের প্রকাশ্য দুশমন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কার পছন্দ গ্রহণ করব-রাহমানের, না শয়তানের?
দুই.
পোশাকের মানদন্ডে বিচার করলেও বোঝা যায় পশ্চিমা সভ্যতা হচ্ছে শয়তানের প্রতিভূ। আর এ কারণেই পশ্চিমা আদর্শের অনুসারীদের পোশাক দিন দিন সংক্ষিপ্ত হচ্ছে। প্রথমে পোশাক ছিল হাটুর নীচ পর্যন্ত, এরপর তা উঠে এল হাটুর উপরে। এরপর এল প্যান্ট-ফতুয়া, এল নেটের জামা, এল টাইটস-সর্টস। যেন হাদীসে বর্ণিত পোশাক পরিহিতা নগ্ন নারীর দৃষ্টান্ত একের পর প্রকাশিত হতে লাগল, যাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, তারা বেহেশতের ঘ্রাণটুকুও পাবে। বেদনার বিষয় এই যে, এই সব দৃষ্টান্ত আমরা দেখতে পাচ্ছি আমাদের মুসলিম-সমাজে। পশ্চিমা সভ্যতা আমাদের তাহলে কোন দিকে নিয়ে চলেছে?
তিন.
বোন! আমরা ভুল পথে চলেছি। পশ্চিমা সংস্কৃতি কখনো আমাদের অনুকরণের বস্ত্ত হতে পারে না। ঐ সভ্যতায় কি নারীর বিন্দুমাত্র মর্যাদা আছে? সেখানে তো নারী নিছক ভোগের বস্ত্ত। বিভিন্ন উপায়ে নারীকে প্রলুব্ধ করা হয়েছে পুরুষের আনন্দের চিতায় আত্মাহুতি দেওয়ার জন্য। এতেই নাকি আধুনিক! নারীর পরম মোক্ষলাভ!
প্রিয় বোন! তুমি যদি হও স্বচ্ছ দৃষ্টির অধিকারী, তোমার বুকে যদি থাকে মিথ্যাকে প্রত্যাখ্যান করার শক্তি তাহলে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান কর ঐসব প্রতারণার প্রলোভন এবং ফিরে এসো সেই পথে, যার শেষে আছে চির শান্তির আশ্রয়।
তোমার উপর বর্ষিত হোক রাববুল আলামীনের অপার করুণা।